স্বপ্ন প্রতিদিন ডেস্ক
দেশে হামের সংক্রমণ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, যাকে ‘রাতের অন্ধকারে দৈত্যের মতো আক্রমণ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রী। গেল এক মাসেই হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে ১৭৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে শুধু ২৪ ঘণ্টায় প্রাণ হারিয়েছে আরও ১০ শিশু। আর নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে প্রায় দেড় হাজার। সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা বিরাজ করছে রাজধানী ঢাকাসহ ঢাকা বিভাগে। এমন উদ্বেগজনক পরিস্থিতির লাগাম টানতে ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ, বরিশাল ও ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনে শুরু হয়েছে হামের বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি। রোববার ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সি শিশুদের হামের বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির উদ্বোধন করেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। এ সময় তিনি বলেন, রাতের অন্ধকারে দৈত্যের মতো হঠাৎ আমাদের ওপর হাম আক্রমণ করে। তবে আমরা গ্যাভি ও ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের সহায়তায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছি। এজন্য আমরা তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, সবার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় আল্লাহর রহমতে আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে হামের হাত থেকে রক্ষা করতে পারব। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে রেলপথ মন্ত্রণালয় এবং সড়ক পরিবহণ ও মহাসড়ক বিভাগের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে যেভাবে হামের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে, তা উদ্বেগজনক। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম বলেন, বিগত সরকারের অবহেলার কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, একজন হাম আক্রান্ত রোগী ১৮ জন পর্যন্ত ব্যক্তিকে সংক্রমিত করতে পারে। এ কারণে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আইসোলেশন। এ কর্মসূচি চলবে ১২ মে পর্যন্ত। ক্যাম্পেইনে ৪ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সিটি করপোরেশন। স্থায়ী-অস্থায়ী মিলে ৫৪০টি কেন্দ্রে এ টিকা দেওয়া হবে। এদিকে রাজধানীর কড়াইল বস্তির এরশাদ মাঠে হাম-রুবেলার টিকাদান ক্যাম্পেইন উদ্বোধন করেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ১০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে আরও ১৪২৮ শিশু। মৃতদের মধ্যে ৯ জনই ঢাকা বিভাগের। ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ১০ শিশুর মধ্যে ৪ জনের মৃত্যু নিশ্চিতভাবে হামের কারণে হয়েছে। বাকি ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে উপসর্গ নিয়ে (সন্দেহজনক)। এছাড়া নতুন আক্রান্ত ১৪২৮ জনের মধ্যে ১৫০ জন নিশ্চিতভাবে এবং ১২৬৮ জন সন্দেহভাজন হিসেবে শনাক্ত হয়েছে। সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা বিরাজ করছে রাজধানী ঢাকাসহ ঢাকা বিভাগে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত সারা দেশে নিশ্চিতভাবে হামে ২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে হামের লক্ষণ নিয়ে বা সন্দেহজনক হিসাবে মৃত্যু হয়েছে আরও ১৫১ শিশুর। অর্থাৎ, গত এক মাসে দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ১৭৯ জন শিশুর মৃত্যু হলো। একই সময়ে সারা দেশে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছে ২ হাজার ৬৩৯ জন। এছাড়া সন্দেহভাজন আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ২২৫ জনে।
বরিশালে হাম-রুবেলা টিকা ক্যাম্পেইন : বরিশাল ব্যুরো জানায়, সিটি করপোরেশন প্রশাসক বিলকিস আকতার জাহান শিরিন বলেছেন, বরিশালে ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়স পর্যন্ত সব শিশুকে হামের টিকা দেওয়া হবে। তিনি রোববার নগরীর মল্লিকা কিন্ডারগার্টেন হাম-রুবেলার টিকাদান ক্যাম্পেইন উদ্বোধন করেন।
চট্টগ্রামে একদিনে হাসপাতালে ভর্তি ১৯ শিশু : চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, নগরীতে হামের উপসর্গ নিয়ে একদিনে আরও ১৯ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। রোববার চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের পক্ষ থেকে এ তথ্য জানানো হয়। এদিন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরে ১৫ শিশু। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগী ছিল ৮৪ জন।
হাম আক্রান্ত ২ শিশুর মৃত্যু : ময়মনসিংহ ব্যুরো জানায়, ২৪ ঘণ্টায় হাম আক্রান্ত হয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে হাসপাতালে হামে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মোট ১২ শিশুর মৃত্যু হলো।
এদিকে রোববার সকালে টিকাদান কর্মসূচির উদ্বোধন করেন সিটি করপোরেশনের প্রশাসক রোকনুজ্জামান রোকন।
হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেল শিশু মালিহা : উল্লাপাড়া (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, শেষ পর্যন্ত শিশু মালিহাকে বাঁচানো গেল না। জ্বর ও হামের উপসর্গ নিয়ে শনিবার রাতে ঢাকার শ্যামলী হাসপাতলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সে মারা যায়। ১৭ মাস বয়সি মালিহা উল্লাপাড়া উপজেলার বাঙ্গালা ইউনিয়নের ভয়নগর গ্রামের মুকুট আলী মেয়ে। মালিহার পরিবার জানায়, ৭-৮ দিন আগে তার জ্বর হয়। সঙ্গে দেখা দেয় হামের উপসর্গ। প্রথমে উল্লাপাড়ার একটি ক্লিনিকে তার চিকিৎসা দেওয়া হয়। কিন্তু অবস্থার অবনতি হলে চার দিন আগে তাকে ঢাকায় নেওয়া হয়েছিল।