স্বপ্ন প্রতিদিন ডেস্ক
কাতারের সাথে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি থাকা সত্ত্বেও অত্যন্ত চড়া দামে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি ক্রয় করায় বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা গচ্চা দিতে হলো বাংলাদেশকে। শেখ হাসিনা সরকারের আমলে ২০২৩ সালের জুন মাসে কাতারএনার্জি ট্রেডিং-এর সঙ্গে ১৫ বছর মেয়াদি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যার আওতায় ২০২৬ সাল থেকে বছরে ১.৮ মিলিয়ন টন এলএনজি (৯ কোটি ৪৫ লাখ এমএমবিটিইউ) ৯.৫ থেকে ১১ ডলার প্রতি এমএমবিটিইউ দরে আমদানির কথা ছিল। এর আগে ২০১৮ সালের করা চুক্তি অনুযায়ি বাংলাদেশ কাতার থেকে ২.৫ মিলিয়ন টন (প্রায়) ক্রয় করতো ৯.৫–১১ ডলার প্রতি এমএমবিটিইউ দরে।
পেট্রোবাংলার এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আসন্ন গ্রীষ্মকালীন চাহিদা মেটাতে মে মাসে বাংলাদেশ ১১টি এলএনজি কার্গো আমদানি করবে। এর মধ্যে মাত্র ৩টি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় আসবে, বাকি ৮টি স্পট মার্কেট থেকে কিনতে হবে। স্পট মার্কেটের অস্থিরতার কারণে আমদানি ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে গেছে।
মার্চ-এপ্রিল মাসে স্পট কার্গোগুলোর গড় দাম ছিল ২০ থেকে ২২ ডলার প্রতি এমএমবিটিইউ। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে যেসব কার্গো এসেছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- টোটালএনার্জিস গ্যাস অ্যান্ড পাওয়ার লিমিটেড (ইউকে): ২১.৫৮ ডলার প্রতি এমএমবিটিইউ (৫-৬ই এপ্রিল)
- পস্কো ইন্টারন্যাশনাল কর্পোরেশন (দক্ষিণ কোরিয়া): দুটি কার্গো প্রতিটি ২০.৭৬ ডলার (৯-১০ই এপ্রিল ও ১২-১৩ই এপ্রিল)
এপ্রিল মাসে মোট ৯টি কার্গোর মধ্যে ৮টি ছিল স্পট মার্কেটের। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত ১১টি স্পট কার্গো কিনেছে। কাতারএনার্জি মার্চ মাসে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে কাতার এই ব্যবস্থা নেয়। যুদ্ধবিরতির পর কাতারএনার্জি পুনঃউৎপাদনের পথে রয়েছে। এই সংকটের কারণে মার্চ-এপ্রিল মাসে সরকারকে অতিরিক্ত ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা (প্রায় ৩৬৬.৭৫ মিলিয়ন ডলার) ভর্তুকি বাড়াতে হয়েছে। গত বছর বাংলাদেশ তার মোট এলএনজি আমদানির অর্ধেকেরও বেশি কাতার থেকে নিয়েছিল। বর্তমানে জ্বালানি আমদানির জন্য সরকার ২ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক অর্থায়ন চেয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, মার্চ-জুন পর্যন্ত শুধু জ্বালানি ও সারের জন্য অতিরিক্ত বৈদেশিক মুদ্রা প্রয়োজন হতে পারে ২.৬১ বিলিয়ন ডলার। বিশ্ববাজারে দামের ওঠানামার মধ্যেও ২০২৩ ও ২০২৪ সালে বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে কম দামে এলএনজি আমদানি করতে পেরেছিল। তবে ইউনূস সরকারের আমলে আমদানির পরিমাণ বাড়ার সাথে সাথে মোট ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। পেট্রোবাংলা ও আরপিজিসিএল সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ গড়ে ১২.৮৪ ডলার প্রতি এমএমবিটিইউ দরে এলএনজি আমদানি করেছে। ৮৬টি কার্গো আমদানিতে মোট ব্যয় হয় প্রায় ৩.০২ বিলিয়ন ডলার। ২০২৩ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে গড় দাম ছিল ১৩.৫০ থেকে ১৫.০০ ডলার প্রতি এমএমবিটিইউ-এর মধ্যে। অন্যদিকে, ইউনূস সরকারের আমলে ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ১০৯টি কার্গো আমদানি করে মোট ৩.৮৮ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ৪৬,০০০ কোটি টাকা) খরচ করে। এ সময় গড় দাম ছিল ১৩.৫২ ডলার প্রতি এমএমবিটিইউ।
যদিও ইউনূস সরকারের আমলে বাংলাদেশ ও কাতারের মধ্যে ২০১৮ সালে সম্পাদিত চুক্তি চলমান ছিল এবং বাংলাদেশের সুযোগ ছিল সেই দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির অধীনে কাতার থেকে ২.৫ মিলিয়ন টন (প্রায়) এলএনজি ৯.৫–১১ ডলার প্রতি এমএমবিটিইউ দরে কেনার, তবুও ইউনূস তার পরম মিত্র- সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের কোম্পানি (এক্সিলারেট এনার্জি) থেকে উচ্চমূল্যে এলএনজি ক্রয় করে।
২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কাতারের সাথে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির বাইরে গিয়ে ইউনূস সরকারের এলএনজি ক্রয়ে অতিরিক্ত প্রায় ১০,০০০ কোটি টাকা (৮৫৫ মিলিয়ন ডলার) বেশি খরচ হয়েছে বলে পেট্রোবাংলা সূত্র জানিয়েছে।
এই অতিরিক্ত ব্যয় মূলত স্পট মার্কেট ও উচ্চমূল্যের স্বল্পমেয়াদি চুক্তির কারণে হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির সুবিধা থাকা সত্ত্বেও স্পট মার্কেটের দামের ওঠানামা জ্বালানি খাতের সাবসিডি বোঝা বাড়িয়ে দিয়েছে। ২০২৫ সালে এলএনজি সাবসিডি ব্যয়ও আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে স্পট দাম আবার বেড়ে যাওয়ায় ২০২৬ সালে জ্বালানি আমদানির খরচ আরও চাপ তৈরি করছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির সুবিধা পাওয়ার পরও বৈশ্বিক সংকটের কারণে বাংলাদেশকে বারবার চড়া দামে স্পট মার্কেটে নির্ভর করতে হচ্ছে, যা জ্বালানি খাতের সাবসিডি বোঝা আরও বাড়িয়ে তুলছে। মে মাসে দাম কিছুটা কমলেও (টোটালএনার্জিস ১৯.৮২৫ ডলার, আরামকো ১৯.১৯৪ ডলার) সামগ্রিক সংকট অব্যাহত রয়েছে।






