দেশজুড়ে চলমান বিদ্যুৎ সংকট ও ঘনঘন লোডশেডিংয়ের প্রভাবে ভেঙে পড়েছে প্রান্তিক স্বাস্থ্যসেবা। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎহীন থাকায় হাসপাতালগুলোর ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ। অন্ধকার, তীব্র গরম ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হওয়ায় কষ্ট বেড়েছে রোগী ও তাদের স্বজনদের। কোথাও জেনারেটর থাকলেও জ্বালানির অভাবে তা চালানো যাচ্ছে না। আবার কোথাও সীমিত সোলার ব্যবস্থার কারণে অফিস কক্ষ সচল থাকলেও সাধারণ রোগীদের ওয়ার্ডগুলো থাকছে অন্ধকারে। এতে স্বাস্থ্যসেবার মান প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি রোগীদের ভোগান্তি এখন চরমে।
সরকারি তথ্যমতে, চলতি মাসে দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি দুই হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে। এতে দেশজুড়ে লোডশেডিংয়ের মাত্রা বেড়েছে। শহরের তুলনায় গ্রামে এর প্রভাব আরও ভয়াবহ; কোথাও কোথাও ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। একদিকে গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরম, অন্যদিকে বিদ্যুতের এই আসা-যাওয়ায় গ্রামীণ জনপদে নেমে এসেছে চরম অস্থিরতা। যার নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি পড়ছে স্বাস্থ্যসেবা খাতে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত গতকাল বৃহস্পতিবার বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৩০৭ মেগাওয়াট। সবচেয়ে বেশি লোডশেডিং ছিল এক হাজার ৯৩৫ মেগাওয়াট। মূলত গ্যাসের স্বল্পতা, খরচ কমাতে জ্বালানি তেলের সাশ্রয়ী ব্যবহার, উদ্যোক্তাদের বকেয়া এবং কয়লা আমদানিতে জটিলতার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হচ্ছে। দেশের মোট ১৪৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে অন্তত ৬৬টি কেন্দ্র গ্যাস, কয়লা ও ফার্নেস অয়েলের ঘাটতির কারণে উৎপাদন সংকটে রয়েছে। বিশেষ করে চট্টগ্রামের এসএস পাওয়ারের এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের কেন্দ্র থেকে মাত্র ৬১২ মেগাওয়াট এবং কক্সবাজারের মাতারবাড়ীর এক হাজার ২০০ মেগাওয়াটের কেন্দ্র থেকে ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আসছে। এর ফলে গতকাল রাত ৯টায় গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র থেকে পাঁচ হাজার ৩৭০ মেগাওয়াট, কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র থেকে চার হাজার ২৮২ মেগাওয়াট এবং ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে দুই হাজার ৫৭৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে। তবে পিডিবির গ্রীষ্মকালীন পরিকল্পনা অনুযায়ী, গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র থেকে পাঁচ হাজার ২০০ মেগাওয়াট, কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র থেকে পাঁচ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট এবং ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে তিন হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারিত ছিল।
বরিশাল সদর হাসপাতালের ডায়রিয়া ওয়ার্ড নামে পরিচিত ১২ শয্যার কক্ষটিতে বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় ২৫ রোগী ভর্তি ছিল। তখন বিদ্যুৎ ছিল না। প্রতিটি রোগীর সঙ্গে অন্তত একজন করে স্বজন থাকায় কক্ষটিতে তখন কমপক্ষে ৫০ জন মানুষের ভিড়। স্বজনরা নিজেরা ঘেমে একাকার হলেও নিরুপায় হয়ে হাতপাখা দিয়ে রোগীকে বাতাস করছেন। ওয়ার্ডে কথা হয় মুরাদের সঙ্গে, যিনি তাঁর ডায়রিয়ায় আক্রান্ত শাশুড়িকে ভর্তি করিয়েছেন। তিনি জানান, সকাল ৮টায় শাশুড়িকে ভর্তি করার পর বিকেল ৩টা পর্যন্ত চারবার বিদ্যুৎ গেছে। এর মধ্যে বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত টানা বিদ্যুৎ ছিল না। জেনারেটরসহ বিকল্প কোনো ব্যবস্থাই নেই এই হাসপাতালে। বরিশালের শের-ই-বাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় (শেবাচিম) হাসপাতালের চিত্রও প্রায় একই। মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার রাজীব (৩০) গত ১ এপ্রিল থেকে এই হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন। বৃহস্পতিবার দুপুর ১টার দিকে সেবিকা যখন তাঁর হাতে আইভি স্যালাইন পুশ করছিলেন, ঠিক তখনই বিদ্যুৎ চলে যায়। এরপর রাজীব নিজে এক হাতে মোবাইলের টর্চ ধরে রাখলে সেবিকা স্যালাইন পুশ করতে সক্ষম হন।
ভাঙ্গা (ফরিদপুর) উপজেলায় বিদ্যুতের চাহিদার অর্ধেকেরও কম সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে। এতে ভেঙে পড়েছে স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবা। দিনরাত মিলে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ না থাকায় বিশেষ করে বয়স্ক, শিশু ও মুমূর্ষু রোগীদের ভোগান্তির শেষ নেই। বিদ্যুৎ চলে গেলেই পুরো হাসপাতাল অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে এবং সৃষ্টি হচ্ছে প্রচণ্ড গুমোট গরমের। এমন পরিস্থিতিতে রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও নার্সরা। হামেরদী ইউনিয়নের এক নারী জানান, তাঁর মায়ের হঠাৎ পেটে ব্যথা ও জ্বর দেখা দিলে হাসপাতালে ভর্তি করেন। কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের কারণে হাতপাখা দিয়েই বাতাস করে মাকে কিছুটা স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি।
রৌমারী (কুড়িগ্রাম) বৃহস্পতিবার দুপুর ১টার দিকে সরেজমিন দেখা গেছে, ৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জেনারেটর চালু না করায় রোগীরা নিদারুণ কষ্টে আছেন। শুধু হাইব্রিড সোলার প্যানেল সংযোগে লাইট জ্বললেও একটি ফ্যানও ঘুরছে না। শিশু ও বৃদ্ধ রোগীরা গরমে হাঁসফাঁস করছেন। অথচ অফিস কক্ষে ফ্যান-লাইট ঠিকই চলছে। শরীরে পানি জমার সমস্যা নিয়ে ভর্তি হওয়া আবু সাঈদ বলেন, ‘যেদিন ভর্তি হয়েছি, সেদিন থেকে বিদ্যুৎ নেই। ফ্যান চলে না। সোলারের লাইট আছে; কিন্তু কিছুক্ষণ চলার পর তাও বন্ধ হয়ে যায়।’ রৌমারী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আব্দুস সামাদ বলেন, জেনারেটর সচল রয়েছে। কিন্তু তেল সাশ্রয়ের জন্য দিনে বন্ধ রেখে রাতে চালু করা হয়। সোলারের সক্ষমতা সীমিত হওয়ায় সব জায়গায় একসঙ্গে সংযোগ দেওয়া সম্ভব হয় না।