পারস্য উপসাগরের যুদ্ধ পাকিস্তানকে ঠেলে দিচ্ছে অন্ধকারে। ইসলামাবাদে বিদ্যুৎ এখন মোহাম্মদ রিজওয়ানের জন্য বিলাসিতার মতো হয়ে গেছে। এক সপ্তাহ ধরে ৫২ বছর বয়সী এই ব্যক্তি প্রতিদিনই লাহোরে তার বাসায় বিদ্যুৎ বিভ্রাটের মুখে পড়ছেন। সকালে অফিসে বের হওয়ার সময় বিদ্যুৎ থাকে না। বাসায় ফিরে এলেও একই অবস্থা। তার রান্নাঘরে দিনে মাত্র দুই ঘণ্টা পাইপলাইনের গ্যাস আসে। ফলে পরিবারকে ব্যয়বহুল সিলিন্ডারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন দ্য স্ট্রেইটস টাইমস। রিজওয়ান বলেন, এই বিদ্যুৎ বিভ্রাট আমাদেরকে প্রস্তুর যুগে ফিরিয়ে নিয়েছে। তিনি তার স্ত্রী, মা ও দুই সন্তানকে নিয়ে শহরের কেন্দ্রের কাছে ঘনবসতিপূর্ণ একটি এলাকায় থাকেন।
পারস্য উপসাগরে সাত সপ্তাহ ধরে চলা যুদ্ধের কারণে তেল ও গ্যাসের গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতিগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরবরাহ ধীরে ধীরে পুনরায় শুরু হলেও এই দেশগুলোর অর্থনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত থেকে যাবে। তবে খুব কম দেশই পাকিস্তানের মতো এত তীব্রভাবে এই সংকট অনুভব করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের হামলার আগেই দেশটি দুর্বল আর্থিক অবস্থা এবং প্রতিবেশী আফগানিস্তানের সঙ্গে সংঘাতের চাপে ছিল।
এমন পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে একটি অপ্রত্যাশিত মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উঠে এসেছে পাকিস্তান। সৌদি আরব, ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে তারা যোগাযোগের একটি সেতুবন্ধন তৈরি করেছে। ইসলামাবাদে আলোচনা আয়োজন করা তাদের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্য। কিন্তু আলোচনা আবার শুরু হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও, পাঁচতারকা হোটেলের আরামদায়ক পরিবেশেও আলোচকদের হয়তো জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হবে।
ইরানে যুদ্ধ শুরুর এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে পাকিস্তান কঠোর সাশ্রয়ী পদক্ষেপ নিতে শুরু করে। তার মধ্যে আছে দোকান ও রেস্তোরাঁ আগে বন্ধ করা, সরকারি ব্যয় কমানো এবং সরকারি কর্মচারীদের বাসা থেকে কাজ করতে উৎসাহ দেয়া। জ্বালানির দাম হঠাৎ বেড়ে যায়, এমনকি দেশের শীর্ষ ক্রিকেট টুর্নামেন্ট পাকিস্তান সুপার লিগও দর্শকদের ঘরে থাকার আহ্বান জানায়। এরপর থেকে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।
বর্ষা মৌসুমের আগে তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে। এই সময়েই সংকটটি আরও গভীর হয়েছে। পাকিস্তানের জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সন্ধ্যায় দুই থেকে তিন ঘণ্টা লোডশেডিং করা হবে। তবে দেশজুড়ে পরিবার ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে জানা গেছে, অনেক এলাকায় এটি দিনের অর্ধেকেরও বেশি সময় স্থায়ী হচ্ছে।
ফেডারেশন অব পাকিস্তান চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি জানিয়েছে, সাম্প্রতিক দিনে কিছু শিল্প খাতে প্রায় আট ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে, যা স্থানীয় ও রপ্তানিমুখী উৎপাদনের জন্য বড় আঘাত। কারখানাগুলো রাতে কাজ বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছে। আর পরিবারগুলো বেশি গ্যাস পেতে অবৈধ পাম্প বসাচ্ছে। মোবাইল টাওয়ারগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, ডিজেল জেনারেটর ও ব্যাটারির চাহিদা বেড়ে গেছে। এমনকি দেশের অনেক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থাও ব্যাটারি ছাড়া চলে। ফলে সূর্য না থাকলে তারা গ্রিডের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ কমে গেলে ধনী দেশগুলো সাধারণত বেশি দাম দিয়ে কিনে নেয়, আর উন্নয়নশীল দেশগুলো ভোগ কমিয়ে দেয়, যেমনটি হয়েছিল ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর। চার বছর পর আবারও একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি হচ্ছে পাকিস্তানের ক্ষেত্রে। জ্বালানিমন্ত্রী আওয়াইস লেঘারি ১৬ এপ্রিল এক ব্রিফিংয়ে বলেন, আমরা যদি বেশি দামে জ্বালানি কিনি, তাহলে বিদ্যুতের দাম বাড়বে এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ পড়বে। আর গ্যাস না থাকলে বিদ্যুৎ ঘাটতি ও লোডশেডিং হবে।
পাকিস্তানের মূল সমস্যা হলো এলএনজির ওপর নির্ভরতা। এটা দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন, কারখানা চালানো, রান্না ও সার উৎপাদন হয়। এই সংকটে দেশটিকে বিদ্যুৎ উৎপাদন নাকি সার খাতে গ্যাস দেয়া- এই দুটির মধ্যে বেছে নিতে হচ্ছে। এমনটা বলেন টেকসই উন্নয়ন নীতি ইনস্টিটিউটের জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. খালিদ ওয়ালিদ।
এক দশক আগে দেশীয় উৎপাদন কমে যাওয়ায় পাকিস্তান এলএনজির দিকে ঝুঁকেছিল। পরে কোভিড-পরবর্তী সময়ে জ্বালানির চাহিদা বাড়া এবং ইউরোপে গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ার ফলে সরবরাহকারীরা ধনী দেশগুলোর দিকে ঝুঁকে পড়ে, যা পাকিস্তানকে অর্থনৈতিক সংকটে ফেলে দেয়।
শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সহায়তা নিতে হয়, যার শর্ত ছিল বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়ানো। এরপর সৌর প্যানেলের ব্যবহার বাড়লেও এলএনজির ওপর নির্ভরতা পুরোপুরি কমেনি। ২০২৫ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রায় এক-পঞ্চমাংশই ছিল এলএনজি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে হামলা শুরু করার পর জ্বালানির দাম বাড়ে এবং সরবরাহ কমতে থাকে। শুরুতে সরকার এটিকে কিছুটা সুযোগ হিসেবে দেখে কাতার থেকে কেনার বাধ্যবাধকতা কমানোর অজুহাত হিসেবে। কিন্তু এখন কোনো সরবরাহ না আসায় এলএনজি ফুরিয়ে যাচ্ছে, আর বিকল্প উৎস তা পূরণ করতে পারছে না।
সরকারের তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যুতের চাহিদা ১৬,৫০০ মেগাওয়াট ছাড়ালেই এলএনজি প্রয়োজন হয়। গত সপ্তাহে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও জলবিদ্যুৎ কমে যাওয়ায় প্রায় দিনই এই সীমা ছাড়িয়েছে। প্রতি অতিরিক্ত ৫০০ মেগাওয়াট চাহিদার জন্য এক ঘণ্টা লোডশেডিং করতে হচ্ছে। কয়েকবার চাহিদা ১৮,০০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। ফলে কিছু এলাকা অন্যদের তুলনায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মে মাস থেকে দেশের সবচেয়ে বড় শহর করাচিতেও লোডশেডিং শুরু হবে। পাঞ্জাবের মিঞা চন্নুর স্কুলশিক্ষক উমর দারাজ বলেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ যাচ্ছে। ২০১৮ সালের পর এমন পরিস্থিতি আর দেখিনি।
পাকিস্তানের অন্যতম বড় মোবাইল অপারেটর ইউফোন সতর্ক করেছে, আট ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ না থাকায় সেবা ব্যাহত হতে পারে। তারা জানায়, ব্যাকআপ ব্যাটারি পুরো চার্জ করতে অন্তত তিন থেকে চার ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রয়োজন, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তা সম্ভব হচ্ছে না। উৎপাদক ও ছোট ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাড়তি জ্বালানি খরচ ও লোডশেডিং তাদের জন্য মৃত্যুঘণ্টা হয়ে উঠেছে। ক্রিকেটপ্রেমীদের জন্যও পরিস্থিতি হতাশাজনক। মে মাসের শুরু পর্যন্ত চলা পাকিস্তান সুপার লিগে স্টেডিয়াম ফাঁকা থাকায় অর্থনৈতিক ক্ষতি ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। পেশাওয়ার জালমি দলের মালিক জাভেদ আফ্রিদি বলেন, পাকিস্তানে এমন বড় ইভেন্ট খুব কম। এই লিগ দেশের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখে পেশাওয়ার ও মুলতানের মতো শহরে পর্যটন বাড়ায়। তিনি জানান, মার্চেন্ডাইজ বিক্রি ৪০ শতাংশ কমে গেছে। মনে হচ্ছে আমরা আবার কোভিড সময়ের মতো পরিস্থিতিতে ফিরে গেছি।






