সুনামগঞ্জের হাওরে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নিয়ে এবার ধান কাটা শুরু হয়েছে। ডিজেল সংকট নিয়ে উদ্বেগে কৃষক। কৃষি শ্রমিকের অভাবে হাওরাঞ্চলের বড় কৃষকরা ধান কাটার জন্য কম্বাইন হারভেস্টার যন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু হারভেস্টার চালানোর জন্য ডিজেল পাওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভুগছেন কৃষক। পর্যাপ্ত পরিমাণে ডিজেল না পেলে যান্ত্রিকভাবে ধান কাটার কাজ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার নিয়ামতপুর গ্রামের হারভেস্টারের মালিক আব্দুল হক বললেন, বুধবার থেকে করচার হাওরে ধান কাটা শুরু করেছেন তিনি। মেশিনে তেল ছিল। প্রথম দিন প্রতি কেয়ারে ধান কাটতে (তিন কেয়ারে এক একর) এক হাজার ৯০০ টাকা হিসাবে নিয়েছি, দুই কেয়ার কাটতে পেরেছি। বৃহস্পতিবার চার-পাঁচ কেয়ার কাটা হয়েছে। শুক্রবার আর মেশিনে তেল থাকবে না। তেল কিনতে পাম্পে গিয়েছিলেন। পাম্পের লোকজন জানালেন, এখন থেকে ডিজেল নিতে হলে কৃষি অফিসার আর ইউএনওর স্বাক্ষর দেওয়া স্লিপ লাগবে। বৃহস্পতিবার বিকেলে প্রথমে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার শনাক্তকরণ স্লিপ, পরে কৃষি কর্মকর্তা এবং ইউএনওর স্বাক্ষর দেওয়া প্রত্যয়ন নিয়েছেন ২০০ লিটার তেলের। এরপর শহরের ওয়েজখালীর পাম্পে গেলে তারা বলল, ১০০ লিটারের বেশি দিতে পারবে না। সেখানে তেল না পেয়ে ২১ কিলোমিটার দূরের দিরাই সড়ক মোড়ের পাম্পে গিয়ে তেল নিয়েছি।’
কেবল আব্দুল হক নন, বৃহস্পতিবার সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা কৃষি অফিস থেকে তেলের স্লিপ নেওয়া আট হারভেস্টার মালিকই এভাবে ডিজেলের জন্য পাম্পে পাম্পে ঘুরেছেন।
জেলার তাহিরপুর উপজেলার বড়দল গ্রামের বাসিন্দা জামাল উদ্দিন। তিনি দুটি হারভেস্টার মেশিন সংগ্রহ করেছেন। এলাকার অনেক কৃষকও তাঁর হারভেস্টার মেশিনের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু তীব্র ডিজেল সংকটের কারণে হারভেস্টারে পূর্ণ সক্ষমতায় ধান কাটতে পারছেন না্ এতে তিনি যেমন আর্থিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়ছেন, তেমনি সময়মতো ধান কাটতে না পারায় কৃষকরাও উদ্বেগে রয়েছেন।
দিরাই উপজেলার তাড়ল ইউনিয়নের কাদিরপুর গ্রামের বাসিন্দা রেনু মিয়া বলেন, আমি হবিগঞ্জের মাধবপুর থেকে দুটি হারভেস্টার মেশিন ভাড়া এনেছি এলাকার ধান কাটার জন্য। কিন্তু তেলের সমস্যায় ধান কাটতে পারছি না।
শান্তিগঞ্জ উপজেলার হারভেস্টার মেশিন মালিক আবিদুর রহমান টিপু বললেন, আমাদের চারটি হারভেস্টার মেশিন আছে। মেশিন দিয়ে হাওরে ধান কাটা শুরু করেছি। কিন্তু খোলাবাজারে পর্যাপ্ত ডিজেল মিলছে না। এ নিয়ে কথা বলতে আজকে (শুক্রবার) উপজেলা প্রশাসনের কাছে যাবেন।
মাটিয়ান হাওরে প্রায় তিন হাল (৩৬ বিঘা) জমিতে বোরো ধান আবাদ করেছেন কৃষক মাফি আলম। তিনি বলেন, হাওরে ধান পেকে গেছে। কিন্তু ধান কেটে ঘরে তুলতে শ্রমিক পাচ্ছি না। তেলের দাম বাড়ায় মেশিন (হারভেস্টার) পাওয়া যায় না। আবার পাওয়া গেলেও দ্বিগুণ টাকায় কাটতে হচ্ছে।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, এবার সুনামগঞ্জে আবাদ হয়েছে দুই লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর ধান। ইতোমধ্যে সব উপজেলায় ধান কাটা শুরু হয়েছে।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কৃষি প্রকৌশলী তাপস কুমার তালুকদার বললেন, ‘জেলায় ধান কাটার হারভেস্টার মেশিন সচল আছে ৬০২টি, রিপার মেশিন ১৫৫টি। অন্য জেলা থেকেও কিছু ধান কাটার যন্ত্র হাওরের বিভিন্ন এলাকায় এসেছে।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, সম্প্রতি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে, কম্বাইন হারভেস্টার বা রিপার যন্ত্রের মালিক বা তার প্রতিনিধি আগের দিন উপজেলায় এসে তেল নেওয়ার প্রত্যয়ন নিয়ে যাবে। তবেই তারা পাম্প থেকে তেল পাবে। তেলে যেহেতু বৈশ্বিক সংকট এবার, এভাবে ছাড়া কোনো উপায় নেই।