স্বপ্ন প্রতিদিন ডেস্ক
ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ শুরু হতে বাকি মাত্র ৩৩ দিন। তবে বাংলাদেশের দর্শকদের জন্য বড় দুঃসংবাদ হতে পারে ‘ওয়ার্ল্ড কাপ ব্ল্যাকআউট’। গত বছরের সেপ্টেম্বরে ফিফার ডাকা আন্তর্জাতিক টেন্ডারে বিটিভি বা সরকার অংশ না নেওয়ায় কম মূল্যে সম্প্রচার স্বত্ব পাওয়ার বড় সুযোগ আগেই হাতছাড়া হয়েছে। বর্তমানে সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের দাবি করা আকাশচুম্বী মূল্যের মুখে সরকারি ও বেসরকারি কোনো চ্যানেলই এখন পর্যন্ত স্বত্ব কিনতে না পারায় খেলা দেখা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এক জাতীয় দৈনিককে জানিয়েছেন, বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতিতে বিপুল অর্থ খরচ করে সরকারের পক্ষে এই স্বত্ব কেনা সম্ভব নয়। গতকাল তিনি মন্ত্রণালায়ের সীমাবদ্ধতা ও অসহায়ত্বের সুর ধরে বলেন, ‘সরকারের বর্তমান আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় এটি একটি বড় ফ্যাক্টর। সরকারি চ্যানেলে খেলা দেখাতে পারলে দর্শকদের জন্য ভালো হতো, কিন্তু আর্থিক পরিস্থিতির কথা ভেবে আমরা এই মুহূর্তে তা নিয়ে ভাবছি না।’
মন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে এসেছে আগের চুক্তি নিয়ে অসন্তোষও। তিনি বলেন, ‘মনে হচ্ছে গতবার কেনার পেছনে যে টাকা খরচ করা হয়েছিল, তার ১০ ভাগের এক ভাগও তুলে আনা সম্ভব হয়নি।’ স্বপন আরও যোগ করেন, বেসরকারি পর্যায়ে কেউ আগ্রহ দেখালে সরকার বড়জোর পারস্পরিক সুবিধার ভিত্তিতে সহযোগিতার কথা ভাবতে পারে।
ফিফার কাছ থেকে পাওয়া স্প্রিংবকের এই প্যাকেজে টেলিভিশন, রেডিও, মোবাইল ও ইন্টারনেটের সব ধরনের স্বত্ব অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। দ্য ডেইলি স্টারের হাতে আসা নথিপত্র অনুযায়ী, বিটিভির কাছে তারা ১ কোটি ২৩ লাখ ডলার (প্রায় ১৫০ কোটি ৯৮ লাখ টাকা) দাবি করছে, যার মধ্যে ভ্যাট-ট্যাক্স অন্তর্ভুক্ত নেই। শর্ত অনুযায়ী এই অর্থের অর্ধেক আগামী ১০ মের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। অথচ সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত বছর ফিফা যখন টেন্ডার আহ্বান করেছিল, তখন সরকার সরাসরি অংশ নিলে এই অঙ্ক অনেক কম হতে পারত।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরও জানা গেছে, টি স্পোর্টস, স্টার নিউজ এবং একটি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান অনেক কম মূল্যে স্বত্ব কেনার প্রস্তাব দিলেও স্প্রিংবক তাদের দাবিতে অনড়। ফলে ভ্যাট-ট্যাক্স মিলিয়ে খরচ প্রায় ২০০ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকতে পারে। অথচ সূচি অনুযায়ী, ১০৪টি ম্যাচের মধ্যে ৫২টিই শেষ হবে বাংলাদেশ সময় ভোর ৪টার মধ্যে, যা বিজ্ঞাপন সংগ্রহের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
বিটিভির সুযোগ হাতছাড়া
২০২২ বিশ্বকাপের আগে শেষ মুহূর্তে সরকারের সিদ্ধান্তে ৯৮ কোটি টাকা খরচ করে স্বত্ব কিনেছিল বিটিভি। অথচ ২০১৮ বিশ্বকাপে কোনো খরচ ছাড়াই ফিড পেয়েছিল বিটিভি এবং বিজ্ঞাপন থেকে প্রায় ১.৫ কোটি টাকা আয় করেছিল। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিটিভির এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, গত সেপ্টেম্বরের টেন্ডারে অংশ না নেওয়াটা ছিল একটা বড় ভুল। অংশ নিলে হয়তো অনেক কম দামে স্বত্ব পাওয়া যেত। এখন স্প্রিংবকের মাধ্যমে চড়া দাম দিয়ে স্বত্ব কেনা তাদের জন্য কার্যত অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিটিভি গত মাসে ফিফার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে বিনামূল্যে ফিড পাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে জানতে চাইলেও এখন পর্যন্ত কোনো ইতিবাচক উত্তর মেলেনি।
বেসরকারি স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলোর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা স্প্রিংবকের সঙ্গে আলোচনায় থাকলেও চড়া দামের কারণে তা থমকে গেছে। ব্রডকাস্টারদের মতে, বিটিভি যদি ব্যয়ের ভার শেয়ার না করে, তবে বাংলাদেশের বাজারের জন্য এই দাম কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তারা মনে করছেন, ২০২২ সালে বিটিভি ৯৮ কোটি টাকায় স্বত্ব কিনেছিল বলেই এবার ফিফা বাংলাদেশের বাজারমূল্য অনেক বাড়িয়ে ধরেছে।
ব্ল্যাকআউটের ঝুঁকি কেবল বাংলাদেশে নয়, ভারত ও চীনের কোটি কোটি ফুটবল ভক্তের ওপরও ঝুলছে। রয়টার্সের তথ্যমতে, রিলায়েন্স-ডিজনি যৌথভাবে ভারতীয় স্বত্বের জন্য ২০ মিলিয়ন ডলারের মতো প্রস্তাব দিয়েছে, যা ফিফার চাহিদার চেয়ে অনেক কম। সনি কোনো প্রস্তাব দিতেই রাজি হয়নি।
আগামী ১১ জুন বিশ্বকাপ শুরু হতে যাচ্ছে। হাতে সময় এতটাই কম যে, শেষ মুহূর্তে কোনো অলৌকিক কিছু না ঘটলে বাংলাদেশের ড্রয়িংরুমগুলো এবার ফিফা বিশ্বকাপে অন্ধকার থাকার শঙ্কা জোরালো হচ্ছে।






