প্রফেসর জহিরুল হকের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, ফিয়াদ নওশাদ ইয়ামিন
নেতৃত্ব কোনো পদবির নাম নয়, এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া এই দর্শনকে সামনে রেখে নেতৃত্ব ও গবেষণার সমকালীন বাস্তবতা নিয়ে কথা বলেছেন, কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের সম্মানিত উপাচার্য, শিক্ষাবিদ ড. এইচ এম জহিরুল হক। প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, ইঞ্জিনিয়ারিং গবেষণা এবং একাডেমিক ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে তিনি মনে করেন, গবেষণার অগ্রগতি তখনই সম্ভব, যখন শিক্ষার্থীদের আগ্রহ নিজ উদ্যোগে বাস্তবমুখী, অংশগ্রহণমূলক এবং উদ্ভাবন-সহায়ক হয়। এই বাস্তবভিত্তিক নেতৃত্বচর্চার ধারণাই তিনি নরম অথচ সুস্পষ্টভাবে উপস্থাপন করেছেন তাঁর গ্রন্থ Practical Leadership-এ। এই সাক্ষাৎকারে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, শিক্ষার্থীরা কিভাবে নেতৃত্ব গুণ অর্জন করবে এবং নিজ উদ্যোগে গবেষণায় সম্পৃক্ত হবে।
প্রশ্ন: ১. একজন লিডার এর কি কি গুনাবলী থাকা প্রয়োজন?
একজন লিডারের প্রথমে কঠোর পরিশ্রমের গুণাবলী থাকতে হয়। নিজের যায়গায় সৎ থাকতে হবে ও নিয়ম-কানুন ডিসিপ্লিন সঠিক ভাবে না মেনে চললে অন্যকে নেতৃত্ব দেয়া সম্ভব না। একজন লিডার এর মধ্যে যথেষ্ট উদারতা থাকতে হবে। অন্যকে সাহায্য করার মতো মানসিকতা থাকতে হবে। যে কোন পরিস্থিতিতে সহনশীল হতে হবে। হঠাৎ রেগে যাওয়া যাবে না।
সহ্য করার ক্ষমতা থাকতে হবে। যে কোনো পরিস্থিতি ধৈর্য্যর সাথে মোকাবেলা করতে হবে।
এবং কাজের যথেষ্ট স্বচ্ছতা থাকতে হবে। এই গুণ গুলোই মানুষ কে অন্যের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলে।
প্রশ্ন: ২. একজন শিক্ষার্থী কিভাবে নেতৃত্ব চর্চা শুরু করবেন ?
উঃ নিজেকে নেতৃত্ব দেয়া হলো সবচেয়ে বড় লিডারশিপ। একজন মানুষ যখন নিজেকে সবসময় নিয়ম শৃঙ্খলার সাথে পরিচালনা করতে পারবে ভবিষ্যতের জন্য গুছিয়ে নিতে পারবে সময় ম্যানেজমেন্ট থেকে শুরু করে সবকিছুতে নিজেকে পূর্বে তৈরি করে নিতে পারবে তখনই সে সত্যিকারের নেতৃত্ব চর্চা শুরু করতে পারবে। নিজেকে সঠিকভাবে পরিচালনা না করতে পারলে অন্যকে নেতৃত্ব দেয়া যায় না।
তাই প্রথমে নিজের মধ্যে নেতৃত্বের গুণগুলো অর্জন করে সঠিকভাবে পরিচালনা করতে হবে।
প্রশ্ন: ৩. শিক্ষার্থীদের একাডেমিক পড়াশোনা ও ক্যারিয়ারে লিডারশিপের ভূমিকা কতটুকু?
উঃ একাডেমিক সৃজনশীল কাজ থেকে শুরু করে গবেষণা, পেশাগত জীবনে শিক্ষকতা, প্রতিষ্ঠান প্রধান অথবা বড় কোন প্রতিষ্ঠানের ‘সিইও” সব ক্ষেত্রে নেতৃত্বের গুণাবলী প্রয়োজন।
নিজেকে গুছিয়ে যেকোনো কাজের দায়িত্ব সততার সাথে সহনশীলতার মাধ্যমে পালন করেই নেতৃত্ব দেয়া সম্ভব। নিজের ভিতর নেতৃত্বের গুণাবলী থাকলে একাডেমিক নন একাডেমিক যে কোন জায়গায়, অন্য কেউ পরিচালনা করা সম্ভব। তাই সব ক্ষেত্রেই নেতৃত্বের গুণাবলী গুলো নিজের আয়ত্তে আনতে হবে আগে।
প্রশ্ন: ৪. উন্নত দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন গবেষণার সাথে জড়িত সেখানে আমাদের দেশের শিক্ষার্থীরা এখনো পিছিয়ে রয়েছে – এর কারণ আপনি কী মনে করেন
উঃ বাংলাদেশের উচ্চপর্যায় থেকে শুরু করে নীতি নির্ধারক পর্যায়ে বেশিরভাগ সিদ্ধান্ত গবেষণা ছাড়াই নেয়া হয়। গবেষণা জরিপ ছাড়া কোন সিদ্ধান্ত নেয়ার ফলে সেটার ফলাফল নিম্ন পর্যায়ে পর্যন্ত আসে। শুধু উন্নত দেশ না আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশেও, রাজনৈতিক কূটনীতিক যে কোন সিদ্ধান্ত নেয়ার পূর্বে তারা গবেষণা করে জরিপ করে দেখে সেটা আদৌ কতদূর সুদূরপ্রসারী হবে , কিংবা তার ফলাফল কি হতে পারে।তারপর সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু বাংলাদেশে কোন সিদ্ধান্তের পূর্বে এই গবেষণার বিষয়টা নেই। গবেষণা ছাড়া যে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেই তা ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
কোন সিদ্ধান্ত নেয়ার পূর্বে গবেষণার চর্চা না থাকার কারণেই আমরা মূলত পিছিয়ে আছি।
বাংলাদেশে গবেষণার পরিধি ও পরিমাণ এখন ছোট, পর্যাপ্ত পরিবেশ ও সুযোগ নেই যার কারণে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করার সুযোগ ও সীমিত। গবেষণার অভাবে অনেক উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়নেও ত্রুটি থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
প্রশ্ন: ৫.শিক্ষার্থীদের মানোন্নয়নের জন্য কী ধরনের পদক্ষেপে গ্রহণ করেছেন।
উ: “শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার মান উন্নয়নের জন্য ইতিমধ্যে আমরা কাজ করছি,
বিশ্ববিদ্যালয় যেকোনো মূল্যায়ন পরীক্ষার ফলাফল নতুন কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সকল বিভাগীয় প্রধানের সাথে আলোচনা করে জরিপ করে, ডিনদের সাথে আলোচনা করে, গবেষণার বিষয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছি।”
বিশেষ করে বিভাগীয় প্রধান ও ডক্টরদের মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও গবেষণা একটা মানদন্ড।
প্রতিটি শিক্ষকের বার্ষিক মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও গবেষণা করা হয়, এছাড়াও উলি রেংকিং শিক্ষার্থীদের নিয়মিত সেমিনার ওয়ার্কশপ ইত্যাদির মাধ্যমে গবেষণার সাথে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা চলমান।”
“শিক্ষার্থীদের গবেষণার সাথে সম্পৃক্ত করার জন্য ইতিমধ্যে সকল শিক্ষকদের সাথে আলোচনা করেছি এবং দিকনির্দেশনা ও দিয়েছি”। সেই সাথে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন পরীক্ষাতেও গবেষণাকে সম্পৃক্ত করে ভবিষ্যতে আরো গভীরভাবে সম্পৃক্ত করার প্রত্যাশা রয়েছে।” সামনে আরো ভালো কিছু করার সুযোগ রয়েছে, শিক্ষা সহশিক্ষা কিংবা গবেষণা সবদিক থেকেই।
প্রশ্ন: ৬. তরুণদের গবেষণায় আসার বিষয়ে আপনার পরামর্শ কী?
উঃ তরুণ ও শিক্ষার্থীদের জন্য আমার পরামর্শ হলো ভালো গবেষণার জন্য শুধু অর্থ বা ফান্ডের জন্য অপেক্ষা না করে নিজের চেষ্টায় লেগে থাকা। শুধু অর্থ সহায়তায় যে গবেষণা প্রবন্ধ তৈরি হবে তা না বরং জরিপ করে অনুসন্ধান করে নিজ চেষ্টায়ও বিশ্বমানের গবেষণা প্রবন্ধ তৈরি করা সম্ভব। যদি নিজের আগ্রহ থাকে তাহলেই সম্ভব। স্ব উদ্যোগে স্ব ইচ্ছায়,
চেষ্টা করতে হবে। গবেষক থেকে প্রশাসক সকল এর ই আগ্রহ থাকতে হবে।শিক্ষকদের ও আগ্রহ থাকতে হবে।
“শিক্ষকরা আগ্রহী হলে শিক্ষার্থীদের আরো বেশি সম্পৃক্ত করতে পারবে।” তবেই আমরা গবেষণা করে এগিয়ে যেতে পারবো। তাই শিক্ষার্থীদের কাছে আমার অনুরোধ থাকবে, “তোমরা নিজ উদ্যোগে গবেষণার প্রস্তাব নিয়ে আসো,”বিষয় নিয়ে আসো”। গবেষণার মাধ্যমে সমাজে উক্ত বিষয় কি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে, কি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে,কিংবা মানুষের কেন প্রয়োজন? সেগুলা বের করে, নিজ উদ্যোগে প্রস্তাব করো।” বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে গবেষকরা তোমাদের কাজে উৎসাহ ও সাহায্য করতে পারবে। একটি কার্যকর গবেষণা সংস্কৃতি গড়ে উঠবে।