স্বপ্ন প্রতিদিন ডেস্ক
শ্রেণি শিক্ষকের সঙ্গে ‘অশোভন আচরণ’, বাসায় ডেকে নিয়ে ওই শিক্ষককে ‘হেনস্থা’র অভিযোগ ওঠার পর সুপ্রিম কোর্টের বিচারক আলী রেজার ছেলে রাজধানীর কাকরাইলের উইল্স লিট্ল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে ছাড়পত্র নিয়ে চলে গিয়েছে। গত ২১ এপ্রিল তার অভিভাবককে ছাড়পত্র বুঝিয়ে দিয়েছে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ওই ছাত্র দশম শ্রেণিতে পড়ছিল। ২০২৫ সালে স্কুলটিতে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিল সে।
প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ আ ন ম শামসুল আলম মঙ্গলবার দুপুরে বলেন, ‘‘ওই ছাত্রকে ওর অভিভাবক নিয়ে গেছেন, টিসি নিয়ে চলে গেছে। যেদিন ঘটনা ঘটেছে, তার পরের দিনই নিয়ে গেছেন। অভিভাবকরা স্ব-উদ্যোগেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।”
মঙ্গলবার দুপুরে বিদ্যালয়টিতে গিয়ে দেখা গেছে, পাঠদান চলছে। সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় ছিলেন নিরাপত্তা ও পরিবেশ সংরক্ষণের দায়িত্বে থাকা কর্মচারীরা। ঘটে যাওয়া বিষয়টি নিয়ে ছাত্রদের কারও সঙ্গে কথা বলতে নিষেধ করা আছে। অন্য কেউও কিছু বলতে নারাজ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ছাত্র জানান, গত ১৬ এপ্রিল শিক্ষক দয়াল চন্দ্র পাল দশম শ্রেণিতে পাঠদানের সময় এক ছাত্রের সঙ্গে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। ওই ছাত্র পড়ার একটি বিষয় বুঝতে না পেরে বারবার শিক্ষককে বিরক্ত ও অশোভন (উল্লেখ করা যাচ্ছে না!) আচরণ করে। একপর্যায়ে আচরণগত উত্তেজনা তৈরি হলে শিক্ষক তাকে শাসন করেন। পরে ওই ছাত্র তার বাসায় গিয়ে ঘটনার ভিন্ন ব্যাখ্যা দেন। এরপর তার বিচারক বাবা বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দয়াল চন্দ্র পালকে ১৮ এপ্রিল বিচারকের বাসায় পাঠান। সেখানে তাকে অপমানজনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। এমনকি তাকে সেই ছাত্রের কাছে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করা হয়!
দয়াল স্যারের এখন কী অবস্থা? স্যারের মনের কী অবস্থা? জবাবে অধ্যক্ষ আ ন ম শামসুল আলম বলেন, ‘‘স্যার… স্যারের মতো আছেন, আমরা সরকারের দিকে তাকায়ে আছি, সরকার যে ব্যবস্থা নেবে। আমরা স্মারকলিপি দিয়ে আসছি, ডিসি স্যার আমাদের আশ্বস্ত করেছেন ওনারা ওনাদের মতো দেখবেন। দয়াল স্যারের পক্ষে আমরা সব শিক্ষার্থী, শিক্ষক আমরা সব একসঙ্গে গিয়েছি। ডিসি, অ্যাটর্নি জেনারেলের কাছে, হাইকোর্টে গিয়েছি।’’
স্কুলের পরিবেশ এখন ঠিক আছে? এখন আর কোনো ঝামেলা আছে? জবাবে অধ্যক্ষ আ ন ম শামসুল আলম বলেন, ‘‘আল্লাহর রহমতে ভালো, সবাই ক্লাস করছে, শিক্ষার্থীরা ক্লাসে, টিচাররাও পাঠদান করছেন। সামনে পরীক্ষা। ঈদের আগে মাত্র অল্প কয়দিন ক্লাস আছে, ১৫-২০ দিন।’’
ওই ছেলে কি এই প্রথম এরকম করল নাকি এর আগেও তার এরকম আচরণ ছিল? জবাবে অধ্যক্ষ আ ন ম শামসুল আলম বলেন, ‘‘এর আগে কখনও এরকম আমরা পাইনি।’’
তার কোনো শারীরিক অসুস্থতা বা মানসিক সমস্যা আছে কি না? জবাবে অধ্যক্ষ আ ন ম শামসুল আলম বলেন, ‘‘সেটি বলতে পারব না। এর আগে তো এমন ঘটনা ঘটেনি। ফলে এই ব্যাপারে তো কিছু জানি না। আর যদি থেকে থাকে তো দয়াল স্যার ক্লাস টিচার, উনি ভালো বলতে পারতেন।”
উইল্স লিট্ল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজের বাংলা মাধ্যম দিবা শাখার সহকারী শিক্ষক দয়াল চন্দ্র পালকে বাসায় ডেকে নিয়ে হেনস্তা করার অভিযোগ ওঠে বিচারক আলী রেজার বিরুদ্ধে। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে ২৬ এপ্রিল প্রধান বিচারকের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন শিক্ষার্থীরা। সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী অভিযোগ গ্রহণ করেন। এ সময় প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ আ ন ম শামসুল আলম তাদের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন।
লিখিত অভিযোগে বলা হয়, “শিক্ষক দয়াল চন্দ্র পালকে ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজ বাসায় ডেকে নিয়ে হেনস্তা করে শিক্ষকের পেশাগত মর্যাদা ও মানবিক অধিকারের চরম লঙ্ঘন করেছেন বিচারক আলী রেজা। ছাত্রকে মারধরের অভিযোগ থাকলেও বিচারকের দায়িত্ব ন্যায়সঙ্গত ও আইনানুগ আচরণ করা; আদালতের বাইরে ব্যক্তিগত অবমাননা করা নয়। এটি বিচার বিভাগের সুনাম ও ন্যায়বিচারের নীতির পরিপন্থি।’’
গত ২ মে ঢাকার মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পদ্ধতিগত প্রতিবন্ধকতা এবং এই প্রতিবন্ধকতাগুলো নিরসনের কার্যকর উপায় চিহ্নিতকরণ’ গবেষণার ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘‘এই বিষয়টি আইন মন্ত্রণালয়ের বিষয় না। কারণ সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারপতির বিষয়ে যদি মিসকন্ডাক্টের অভিযোগ আসে, সেটি সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিল দেখবে। আইন মন্ত্রণালয় বা সরকারের কোনোরকম কর্তব্য, দায়িত্ব, সম্পৃক্ততা নেই।’’






