স্বপ্ন প্রতিদিন ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ‘রেসিপ্রোকাল ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট’ নিয়ে তীব্র আপত্তি জানিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। তিনি অভিযোগ করেছেন, চুক্তিটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সম্মতি ছাড়াই স্বাক্ষর করা হয়েছে এবং তার মন্ত্রণালয়কে বাণিজ্য চুক্তি উপদেষ্টা কমিটির সদস্য হিসাবে বিবেচিত না করে, মতামত না নিয়েই বিতর্কিত মাংস ও দুগ্ধজাত পণ্যে চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ২০২৬ সালের ৯ই ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে বাংলাদেশ এই চুক্তি স্বাক্ষর করে। চুক্তির পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট আইইইপিএ (International Emergency Economic Powers Act)-এর অধীনে আরোপিত শুল্ক ব্যবস্থাকে অবৈধ ঘোষণা করে। এরপর মালয়েশিয়া প্রথম দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তিকে ‘নাল অ্যান্ড ভয়েড’ ঘোষণা করে, যা অন্যান্য দেশের জন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছে।
ফরিদা আখতার তার এক কলামে বলেন, ২০২৫ সালের ২রা এপ্রিল প্রস্তাবিত ৩৭ শতাংশ রেসিপ্রোকাল শুল্কের পুনরায় আরোপ এড়াতে অন্তর্বর্তী সরকার এই চুক্তি স্বাক্ষর করে। চুক্তির পর যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পণ্যের ওপর শুল্ক ১৯ শতাংশে নামিয়ে আনে, যা সাময়িক ‘স্বস্তি’ হিসেবে দেখা হলেও এর মূল্য অনেক বেশি।
তিনি সতর্ক করে বলেন, এই চুক্তি মূলত জেনেটিক্যালি মডিফায়েড অর্গানিজম (জিএমও) সমৃদ্ধ মাংস ও দুগ্ধজাত পণ্যের ‘ডাম্পিং’-এর পথ খুলে দিয়েছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা থাকাকালীন তিনি এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।
বাংলাদেশে পশুসম্পদ খাত জীবিকা-ভিত্তিক অর্থনীতির অংশ, যা ৪.১ কোটি পরিবারের ৮০-৮৫ শতাংশের সঙ্গে জড়িত—বিশেষ করে নারীদের। এ খাত জাতীয় জিডিপিতে ২ শতাংশ এবং কৃষি জিডিপিতে ১৬ শতাংশ অবদান রাখে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে এটি শিল্পায়িত কৃষি-পুঁজিবাদী ব্যবস্থা, যেখানে বিপুল ভর্তুকি, কয়েক দশকে অন্তত ৭২ বিলিয়ন ডলার, দেওয়া হয়। বাংলাদেশের ছোট ছোট পশু পালনকারীরা কোনো ভর্তুকি পান না, কিন্তু এখন তারা ভর্তুকিপুষ্ট আমেরিকান পণ্যের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতায় সন্মুখীন হবেন।
চুক্তির আর্টিকেল ২.৩ অনুসারে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রকে অ-বৈষম্যমূলক বা অগ্রাধিকারমূলক বাজার প্রবেশাধিকার দিতে হবে। স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি (এসপিএস) ব্যবস্থা ‘বিজ্ঞান ও ঝুঁকি-ভিত্তিক’ করতে হবে এবং ‘অযৌক্তিক বাধা’ সরাতে হবে।
এছাড়া তৃতীয় দেশের সঙ্গে চুক্তিতেও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হয় এমন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক আর্টিকেল ১.৬, যা জেনেটিক্যালি মডিফায়েড পণ্যের জন্য প্রি-মার্কেট অনুমোদন, লেবেলিং বা অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই আমদানি ও বিপণনের অনুমতি দেয়। যুক্তরাষ্ট্রে মুরগি, গরু ও দুধ উৎপাদনে জিএম সয়াবিন ও বিটি কর্ন ব্যবহার হয়, যা পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে অনেক দেশ মনে করে।
ফরিদা আখতার বলেন, “এটি নয়া-ঔপনিবেশিক ক্ষমতার মতো—শুল্কের হুমকি দিয়ে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক ছাড় আদায় করা হয়েছে।”
তিনি জোর দিয়ে বলেন, চুক্তির আর্টিকেল ৬.৫ অনুসারে বাতিল এবং আর্টিকেল ৬.২ অনুসারে পুনরায় আলোচনার সুযোগ রয়েছে। মালয়েশিয়ার উদাহরণ অনুসরণ করে বাংলাদেশের উচিত চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন করা।
তিনি প্রশ্ন রাখেন—আইনগতভাবে বাংলাদেশ বাধ্য নয়, কিন্তু রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি আছে কি বর্তমান সরকারের?
এই চুক্তি নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের স্বচ্ছতা ও স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে পরামর্শের অভাব নিয়েও সমালোচনা উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জনস্বার্থ ও গ্রামীণ জীবিকার সুরক্ষায় চুক্তিটি পুনর্বিবেচনা জরুরি।






