সজিব শেখ, বিশেষ প্রতিনিধি, জামালপুর:
জামালপুর, বাংলাদেশ উত্তর-মধ্যাঞ্চলের এক সম্ভাবনাময় জনপদ। আজ এটি শুধু একটি জেলা নয়—বরং ধীরে ধীরে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে। কৃষি, ক্ষুদ্র শিল্প, মৎস্যসম্পদ, তাঁতশিল্প, নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতি এবং প্রবাসী আয়ের সমন্বয়ে জেলার অর্থনৈতিক ভিত্তি ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, পরিকল্পিত বিনিয়োগ, শিল্পায়ন এবং আধুনিক অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলে ভবিষ্যতে জামালপুর দেশের অন্যতম অর্থনৈতিক হাব হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
জেলার বিস্তীর্ণ কৃষিজমি এখানকার অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। ধান, পাট, ভুট্টা, সরিষা, আলু ও বিভিন্ন মৌসুমি সবজির উৎপাদনে কৃষকরা প্রতি বছর নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলছেন। বিশেষ করে পাট উৎপাদনে জেলার সুনাম দীর্ঘদিনের। একসময় ‘সোনালি আঁশ’-নির্ভর অর্থনীতি আজ নতুনভাবে জেগে উঠছে বৈশ্বিক বাজারে পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধির ফলে। এতে কৃষক, ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী মানুষের আয়ও ক্রমশ বাড়ছে।
এছাড়া নদীবেষ্টিত চরাঞ্চলে কৃষি, গবাদিপশু পালন, মাছ চাষ এবং দুগ্ধ খামার স্থানীয় অর্থনীতিকে দিয়েছে নতুন গতি। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে নকশিকাঁথা, তাঁতের কাপড়, গ্রামীণ কারুশিল্প ও হস্তশিল্প জেলার ঐতিহ্যকে অর্থনীতির শক্তিতে রূপান্তর করেছে।
শিল্প সম্ভাবনার দিক থেকেও জামালপুর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত জামালপুর ইপিজেড (রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল) বাস্তবায়িত হলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিল্পখাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি বাস্তবায়ন হলে উত্তরাঞ্চলের শিল্প মানচিত্রে জামালপুর নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে।
দক্ষিণ এশিয়ার বৃহৎ সার উৎপাদন কারখানা রয়েছে জামালপুরে, এ অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে কারখানাটি,, কৃষি উৎপাদনে সার সরবরাহ নিশ্চিত করে এ শিল্পখাত একসময় জেলার অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। আধুনিকায়নের মাধ্যমে এ খাত পুনর্জাগরণ পেলে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
পাটশিল্পে ঐতিহ্যবাহী আলহাজ জুট মিল একসময় হাজারো মানুষের কর্মসংস্থানের উৎস ছিল। পাটভিত্তিক শিল্পের ঐতিহ্যকে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করে পুনরুজ্জীবিত করা গেলে আবারও জেলার অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখতে পারে। একইসঙ্গে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হিমাগার শিল্প, দুগ্ধ প্রক্রিয়াকরণ ও কৃষিপণ্য সংরক্ষণ শিল্প গড়ে ওঠার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।
জেলার বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ ও শিল্পায়নের গতি বাড়াতে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র ও সাবস্টেশনভিত্তিক অবকাঠামো উন্নয়ন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত হলে শিল্পকারখানা, সেচব্যবস্থা ও ব্যবসা-বাণিজ্যে আরও গতি আসবে।
প্রশাসনিকভাবে জামালপুর জেলার জামালপুর সদর, ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ, বকশীগঞ্জ, মেলান্দহ, মাদারগঞ্জ ও সরিষাবাড়ী—এই সাতটি উপজেলা কৃষি, ব্যবসা, নদীবন্দর, ক্ষুদ্র শিল্প ও মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে জেলার অর্থনীতিকে বহুমাত্রিক শক্তি জোগাচ্ছে।
প্রাকৃতিক সম্পদ, শিল্পায়নের সম্ভাবনা, কৃষিভিত্তিক উৎপাদন, ঐতিহ্যবাহী পাটশিল্প এবং পরিশ্রমী মানুষের সমন্বয়ে জামালপুর আজ এক নবজাগরণের প্রহর গুনছে। নীরবে যেন উচ্চারিত হচ্ছে—
“বাংলাদেশের অর্থনীতির আগামী অধ্যায়ে, জামালপুরও লিখবে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির এক উজ্জ্বল মহাকাব্য।”