বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি ভিশন ২০৩০-এর জন্য রীতিমতো “পারফেক্ট স্টর্ম” বা সবচেয়ে প্রতিকূল পরিস্থিতি।
ভিশন ২০৩০-এর মূল দর্শন হলো — সরকারি আয়ের জন্য তেলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো। অথচ সাম্প্রতিক সংঘাতে সৌদি আরবের তেল অবকাঠামো সরাসরি আক্রান্ত হয়েছে। পূর্ব থেকে পশ্চিমে তেল পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পাইপলাইনটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, যদিও পরে মেরামত করা হয়েছে। কিন্তু স্বাভাবিক রপ্তানি রুটে তেল সরবরাহ এখনো যুদ্ধপূর্ব স্তরে ফেরেনি।
তেলের দাম বাড়ায় বাজেটে কিছুটা স্বস্তি মিলছে ঠিকই, কিন্তু এই পরিস্থিতি আদতে ক্রাউন প্রিন্সের সেই যুক্তিকেই আরও জোরালো করছে যে, তেলের ওপর নির্ভরতা কমানো এখন সময়ের দাবি।
ভিশন ২০৩০-এর সবচেয়ে আলোচিত অংশ হলো একগুচ্ছ বিশাল অবকাঠামো প্রকল্প, যেগুলো “গিগা-প্রজেক্ট” নামে পরিচিত। এর মধ্যে সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী হলো উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় মরুভূমিতে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা বিশাল অঞ্চল নিওম, যেখানে বিলাসবহুল রিসোর্ট থেকে শুরু করে স্কি ভিলেজ পর্যন্ত সবকিছু থাকার কথা ছিল।
এর কেন্দ্রবিন্দু “দ্য লাইন” — ১৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি রৈখিক শহর, যেখানে ৯০ লাখ মানুষ বাস করবে বলে পরিকল্পনা ছিল। প্রাথমিক বাজেট ছিল ২২ লাখ কোটি ডলারের কাছাকাছি। কিন্তু এখন সেই পরিকল্পনা অনেকটাই ছোট করে আনা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। সরকারি বিনিয়োগ তহবিল অবশ্য দাবি করেছে, কোনো প্রকল্প বাতিল হয়নি — শুধু কিছু প্রকল্পের সময়সূচিতে পরিবর্তন এসেছে।
ভিশন ২০৩০ মূলত বিদেশি বিনিয়োগের ওপর নির্ভরশীল। পরিকল্পনায় বাইরে থেকে প্রায় ১৪ হাজার কোটি ডলার আনার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। কিন্তু আঞ্চলিক অস্থিরতার কারণে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা সতর্ক হয়ে পড়েছেন।
মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতি ও জ্বালানি নীতি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পর্যটন বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক ইভেন্ট আয়োজনের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা সেখানে সরাসরি বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি নিয়ে বিদেশি কোম্পানিগুলো এগিয়ে আসতে দ্বিধা করছে।
এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যেও সৌদি আরব বৈশ্বিক ক্রীড়া মানচিত্রে নিজের জায়গা পোক্ত করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর মতো বিশ্বমানের ফুটবলারদের সৌদি প্রো লিগে টেনে আনার মাধ্যমে ফুটবলকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। ৪০ বছর বয়সী এই তারকার বার্ষিক চুক্তি ৩৪ কোটি ডলারেরও বেশি বলে জানা গেছে।
তবে এই উদ্যোগকে কেউ কেউ “স্পোর্টসওয়াশিং” বলে সমালোচনা করছেন — অর্থাৎ মানবাধিকারের দুর্বল রেকর্ড ঢাকতে খেলাধুলার আড়াল নেওয়া। ক্রীড়া বিশ্লেষকরা অবশ্য বলছেন, বিষয়টি কেবল ভাবমূর্তি রক্ষার চেষ্টা নয়, এটি অনেক বেশি কৌশলগত — নিজেদের বৈশ্বিকভাবে অপরিহার্য করে তোলার রাজনৈতিক পরিকল্পনা।
২০৩৪ ফিফা বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রস্তুতিও চলছে সমানতালে। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে দেশজুড়ে অবকাঠামো নির্মাণ কাজ এগিয়ে চলছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান যুদ্ধ সৌদি আরবের জন্য সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করেছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো এই সংঘাতের কেন্দ্রে থাকা প্রতিবেশী শক্তির বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযানের একদম মাঝখানে পড়ে গেছে।
হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ যদি প্রতিকূল শক্তির হাতে থেকে যায়, সেটি সৌদি আরবের রপ্তানি সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে — যদিও দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিনের কৌশলগত স্বার্থ বিদ্যমান।
যুদ্ধের ধূলো না সরা পর্যন্ত ভিশন ২০৩০-এর ভবিষ্যৎ কী হবে, তা বলা কঠিন। তবে এটুকু নিশ্চিত — মরুভূমিতে নতুন সভ্যতার যে স্বপ্ন এঁকেছিলেন মোহাম্মদ বিন সালমান, তা বাস্তবে রূপ পেতে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি পথ পাড়ি দিতে হবে।






