নিজস্ব প্রতিবেদক
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখা গেল। নির্বাচনের আগে “সরকারি সুযোগ-সুবিধা নেব না, শুল্কমুক্ত গাড়ি ছাড়ব” — এমন বড় বড় বুলি আওড়ানোর পরও বিরোধী দলীয় সাংসদরা এবার নিজেরাই গাড়ির দাবি তুলে বসলেন।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ প্রথমে প্রতিটি উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্সে এমপিদের জন্য ‘পরিদর্শন কক্ষ’ বরাদ্দ দেওয়ায় সরকারকে ধন্যবাদ জানান। তারপরই তিনি যাতায়াতের সুবিধার্থে সংসদ সদস্যদের জন্য সরকারি গাড়ির ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও চেয়ারম্যানদের গাড়ি থাকলেও এমপিরা ভাড়া গাড়িতে চলাফেরা করেন, যা “লজ্জাজনক”। জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ স্পষ্ট করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অনুশাসনের কথা মনে করিয়ে দেন। তিনি বলেন, নতুন সংসদে এমপিরা কোনো অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা নেবেন না — এটি প্রধানমন্ত্রীর প্রথম অনুশাসন। এমনকি বিদ্যমান আইন সংশোধন করে সংসদ সদস্যদের শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির সুবিধা বাতিলের পরিকল্পনাও রয়েছে। এ সময় বিরোধী দলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান মজা করে বলেন, “ছোটদের ‘না’ বলতে হয় না।” তাঁর এই মন্তব্যে সংসদে হালকা হাসির রোল ওঠে। পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই সংসদ সদস্যদের গাড়ির বিষয়ে আলোচনা করে একটি যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি অনুরোধ জানান।
২৫শে জানুয়ারি কুমিল্লার দেবিদ্বার পৌরসভার মরিচাকান্দা এলাকায় নির্বাচনি উঠান বৈঠকে এনসিপির মুখ্য সংগঠক এবং কুমিল্লা-৪ আসনে জামায়াত জোটের প্রার্থী হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেছিলেন, এমপিদের ট্যাক্স ফ্রি গাড়ি সুবিধা বাতিল করা হবে। এ নিয়ম থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। আমি নির্বাচিত হলে ট্যাক্স ফ্রি গাড়ি সুবিধা নেব না। আমার পরিবারের কাউকে এ সুযোগ নিতে দেব না। আমাদের দেশের প্রধান সমস্যা দুর্নীতি। সমাজ থেকে দুর্নীতি নির্মূল করতে হবে। আমার যেহেতু সম্পদ কম, আমি দুর্নীতি করলে সহজে ধরা যাবে।
বাংলাদেশের সংসদ সদস্যরা (এমপি) তাদের মেয়াদে শুল্ক ও কর মুক্ত সুবিধায় একটি গাড়ি, জিপ বা মাইক্রোবাস আমদানি করতে পারেন। ১৯৮৮ সাল থেকে চালু এই বিতর্কিত সুবিধাটি ২০২৪-২৫ সালের প্রস্তাবিত বাজেটে এই সুবিধা বাতিলের উদ্যোগ নেয়া হয়। এর আগে, দ্বাদশ জাতীয় সংসদের সাবেক সদস্যদের শুল্কমুক্ত সুবিধায় আনা প্রায় ৩১টি বিলাসবহুল গাড়ি শুল্ক পরিশোধ না করায় চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সরকারি যানবাহন অধিদপ্তরে হস্তান্তরের নির্দেশ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। দীর্ঘ ৩৫ বছরে ৫৭২টির বেশি গাড়ি শুল্কমুক্ত সুবিধায় এসেছে, যার ফলে সরকার হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব হারিয়েছে এবং এই সুবিধার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
নির্বাচনের আগে যেখানে বিরোধী দলগুলো শুল্কমুক্ত গাড়ি ও অতিরিক্ত সুবিধার বিরোধিতা করে “জনগণের পাশে থাকার” বড় অঙ্গীকার করেছিল, সেখানে অফিস পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই গাড়ির আবদার — এ ঘটনা রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। জনগণের প্রশ্ন এখন একটাই: অঙ্গীকার কি শুধু নির্বাচনের আগের কথা, নাকি বাস্তবেও প্রযোজ্য? (তথ্য: আজকের জাতীয় সংসদ অধিবেশন)






