1. admin@shwapnoprotidin.com : admin : ddn newsbd
বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৩৭ অপরাহ্ন

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যের আড়ালে সার্বভৌমত্ব বিক্রি!

প্রতিবেদকের নাম :
  • আপডেটের সময় : বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২৬
  • ২১ সময় দর্শন
স্বপ্ন প্রতিদিন রিপোর্ট
জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগে বিদায়ী মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সই হওয়া একটি
বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে দেশজুড়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন,
‘পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি’ বা রেসিপ্রোকাল ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্টের (আরটিএ) মোড়কে
মূলত যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনৈতিক
সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দেওয়া হয়েছে।
গত ৯ ফেব্রুয়ারি (২০২৬) ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ
দিনগুলোতে এই চুক্তি সই হয়। আপাতদৃষ্টিতে এটিকে শুল্ক সমন্বয় ও বাজার
সম্প্রসারণের সাধারণ দ্বিপক্ষীয় চুক্তি মনে হলেও চুক্তির নথি
বিশ্লেষণে এক ভিন্ন ও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। দেখা গেছে, এই চুক্তি কেবল
বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি বাংলাদেশের আমদানি ব্যবস্থাপনা,
ডিজিটাল নীতি, কৌশলগত কেনাকাটা এবং তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক নির্ধারণের
ক্ষেত্রে মার্কিন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আইনি ভিত্তি তৈরি করেছে।

এক নজরে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য:

১. সার্বভৌমত্ব ও নীতিগত স্বাধীনতা খর্ব: আপাতদৃষ্টিতে এটি বাণিজ্য চুক্তি হলেও এর
মাধ্যমে বাংলাদেশের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ বাজার ব্যবস্থাপনা, আমদানি নীতি এবং মান
নির্ধারণী ব্যবস্থার ওপর থেকে নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ বা অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব
খর্ব করা হয়েছে।
২. চরম বৈষম্যমূলক ও অসম শর্ত: চুক্তিতে বাংলাদেশকে অনেক বেশি ছাড় দিতে বাধ্য করা
হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের স্বার্থ ও ক্ষমতা পুরোপুরি অক্ষুণ্ন রেখে
বাংলাদেশের ঘাড়ে একতরফা বাধ্যবাধকতা চাপিয়ে দিয়েছে।
৩. মার্কিন নিষেধাজ্ঞার দাসত্ব (ধারা ৪.১ ও ৪.২): যুক্তরাষ্ট্র তার নিজের স্বার্থে
তৃতীয় কোনো দেশের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বা রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করলে,
চুক্তির কারণে বাংলাদেশকেও বাধ্য হয়ে সেই মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পক্ষে কাজ
করতে হবে।
৪. কৌশলগত ও পারমাণবিক কেনাকাটায় হস্তক্ষেপ (ধারা ৪.৩-৫): যুক্তরাষ্ট্রের
‘অপরিহার্য স্বার্থ’ ক্ষুণ্ন হয় এমন কোনো দেশ থেকে বাংলাদেশ
পারমাণবিক চুল্লি, ইউরেনিয়াম বা পারমাণবিক জ্বালানি কিনতে পারবে না। স্বাধীন
দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর এটি নজিরবিহীন হস্তক্ষেপ।
৫. তৃতীয় দেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে বাধা (ধারা ৩.২ ও ৪.৩): বাংলাদেশ যদি
যুক্তরাষ্ট্রের অপছন্দের বা ‘নন-মার্কেট’ কোনো দেশের সঙ্গে ডিজিটাল
বা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তির সুবিধা বাতিল
করার ক্ষমতা রাখে।
৬. একতরফা শুল্ক আরোপের খড়্গ (ধারা ৬.৪): চুক্তির শর্ত প্রতিপালনের অজুহাতে
যুক্তরাষ্ট্র যেকোনো সময় একতরফাভাবে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর শুল্ক
আরোপের ক্ষমতা নিজেদের হাতে রেখেছে, যা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি
স্থায়ী হুমকি।
৭. ডিজিটাল ও ডেটা নীতিতে মার্কিন নজরদারি: চুক্তির মাধ্যমে বাণিজ্যের আড়ালে
বাংলাদেশের ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা, তথ্যপ্রযুক্তি সংক্রান্ত পলিসি এবং
ডেটা ব্যবস্থাপনার ওপর মার্কিন নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
৮. ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য ও নমনীয়তা হারানো: জ্বালানি ও বাণিজ্যের জন্য বিভিন্ন দেশের
ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশের স্বাধীন কূটনীতি এবং পরাশক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য বজায়
রাখার কৌশলগত নমনীয়তা এই চুক্তির ফলে চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হবে।
৯. স্বচ্ছতার অভাব ও অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া: জাতীয় নির্বাচনের ঠিক প্রাক্কালে,
অন্তর্বর্তী সরকারের একেবারে শেষ সময়ে জনসমক্ষে কোনো ধরনের আলোচনা বা
স্বচ্ছতা ছাড়াই সম্পূর্ণ পর্দার আড়ালে এই চুক্তি সই করা হয়েছে।
১০. সাময়িক সুবিধার বদলে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি: সাময়িক কিছু বাণিজ্যিক বা শুল্ক
সুবিধার মুলা ঝুলিয়ে দীর্ঘমেয়াদে দেশের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎকে
ওয়াশিংটনের ইচ্ছার অধীনস্থ করে ফেলা হয়েছে।
অসম চুক্তি ও কৌশলগত ফাঁদ চুক্তিটিকে একটি ‘অসম চুক্তি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন
সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকেরা। চুক্তির ৬.৪ ধারায় প্রয়োগ বা এনফোর্সমেন্টের
শর্ত রাখা হয়েছে, যা পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্রের অনুকূলে। এই ধারা অনুযায়ী,
যুক্তরাষ্ট্র যদি মনে করে বাংলাদেশ চুক্তির শর্ত মানছে না, তবে তারা
যেকোনো সময় বাংলাদেশি পণ্যের ওপর পুনরায় শুল্ক আরোপ করতে পারবে। অর্থাৎ,
বাণিজ্য সুবিধার মুলা ঝুলিয়ে বাংলাদেশকে বিভিন্ন নীতিমালায় ছাড় দিতে বাধ্য করা
হয়েছে এবং ছড়ি ঘোরানোর ক্ষমতা ওয়াশিংটন নিজেদের হাতেই রেখেছে।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ফাঁদে পররাষ্ট্রনীতি চুক্তির ৪.১ ও ৪.২ ধারা বাংলাদেশের নিজস্ব
ভূরাজনৈতিক নমনীয়তাকে মারাত্মকভাবে সংকুচিত করেছে। এই ধারাগুলোর অধীনে,
যুক্তরাষ্ট্র যদি তার নিজের জাতীয় বা অর্থনৈতিক স্বার্থে
কোনো দেশের ওপর বাণিজ্য বিধিনিষেধ বা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তবে বাংলাদেশকেও সেই
মার্কিন পদক্ষেপ সমর্থন করে একই ধরনের ব্যবস্থা নিতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি আমদানির জন্য উপসাগরীয় অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল একটি
দেশের জন্য এমন শর্ত আত্মঘাতী। এর মানে হলো, বাংলাদেশ আর স্বাধীনভাবে
বাণিজ্য বা কূটনীতি পরিচালনা করতে পারবে না; ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তগুলো নিতে
হবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক স্বার্থের দিকে তাকিয়ে।
তৃতীয় দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ও পারমাণবিক খাতে শর্ত সবচেয়ে নজিরবিহীন হস্তক্ষেপ দেখা
গেছে চুক্তির ৪.৩(৫) ধারায়। এতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ‘অপরিহার্য স্বার্থ’
বিঘ্নিত হয়, এমন কোনো দেশের কাছ থেকে বাংলাদেশ পারমাণবিক চুল্লি, পারমাণবিক
জ্বালানি বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কিনতে পারবে না। একটি স্বাধীন দেশের দীর্ঘমেয়াদি
জ্বালানি অবকাঠামো ও কৌশলগত কেনাকাটায় এ ধরনের শর্ত আরোপকে নজিরবিহীন বলে
মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এছাড়া চুক্তির ৩.২ ও ৪.৩ ধারা অনুযায়ী, বাংলাদেশ যদি যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ
ক্ষুণ্ণ করে এমন কোনো দেশের সঙ্গে ডিজিটাল বাণিজ্য চুক্তি কিংবা কোনো
‘অ-বাজারি’ (নন-মার্কেট) দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করে, তবে
ওয়াশিংটন এই চুক্তি বাতিল ও শুল্ক আরোপ করতে পারবে।
পর্দার আড়ালে রাজনৈতিক সম্মতি! নির্বাচনের ঠিক আগে তড়িঘড়ি করে এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি
চুক্তি সই করা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও প্রশ্ন উঠেছে। তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং
সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান এর আগে দাবি করেছিলেন, চুক্তিটি
‘অন্ধকারে’ হয়নি এবং চূড়ান্ত হওয়ার আগে বিএনপি ও জামায়াতের সম্মতি নেওয়া
হয়েছিল।
তবে সমালোচকেরা বলছেন, জনগণের কাছে ন্যূনতম স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করে রাজনৈতিক
এলিটদের মধ্যে পর্দার আড়ালে এ ধরনের চুক্তির সম্মতি আদায় করাটা অত্যন্ত
সন্দেহজনক। গোপনীয়তা কখনো চুক্তির বৈধতা নিশ্চিত করতে পারে না।
জবাবদিহির দাবি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি কোনো সাধারণ বাণিজ্যিক চুক্তি নয়, বরং এটি
এমন একটি দলিল, যার মাধ্যমে স্বল্পমেয়াদি সুবিধার আশায় দীর্ঘমেয়াদে দেশের
নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা অন্যের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। যেহেতু সাধারণ মানুষকে
এই চুক্তির চড়া মূল্য চোকাতে হবে, তাই চরম রাজনৈতিক ডামাডোলের মধ্যে যারা দরকষাকষি
করেছেন, সম্মতি দিয়েছেন এবং তড়িঘড়ি করে এটি পাস করিয়েছেন—তাঁদের অবিলম্বে
জবাবদিহির আওতায় আনার জোর দাবি উঠেছে।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর
২০২5© এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ*
ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: Smart iT Host