এদিকে মঙ্গলবার চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজে একটি গ্রাফিতিতে ‘গুপ্ত’ লিখে দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও শিবিরের সংঘর্ষ এই আলোচনাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। যার রেশ ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রদল এখন দেয়ালে দেয়ালে গুপ্ত লিখে গ্রাফিতি আঁকছে। ক্যাম্পাসের বাইরেও জেলা-উপজেলায় ছাত্রদল-শিবির পাল্টাপাল্টি হামলার অভিযোগ এনে বিক্ষোভ করেছে।
বুধবার জাতীয় সংসদেও ‘গুপ্ত’ শব্দকে কেন্দ্র করে সরকারি দল ও বিরোধী দলের নেতাদের মধ্যে ব্যাপক হইচই ও উত্তপ্ত বাদানুবাদ হয়েছে। গুপ্তকে ঘিরে চট্টগ্রাম সিটি কলেজের বাইরেও বিভিন্ন শিক্ষাঙ্গনে ছাত্রদল-ছাত্রশিবির মুখোমুখি অবস্থানে থাকায় যে কোনো সময় বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ছাত্রশিবিরের নেতারা দাবি করছেন, তাদের সংগঠনকে উদ্দেশ্য করে ‘গুপ্ত’ শব্দ ব্যবহার করে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। অন্যদিকে ছাত্রদলের নেতারা বলছেন, এটি একটি সাধারণ শব্দ, যার রাজনৈতিক অপব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে। আর এ বিষয়ে ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন হৃদয় বলেন, বিগত সময়ে যারা ‘গুপ্ত’ ছিল, এখন তারা ছাত্রশিবিরের মাধ্যমে নিজেদের প্রকাশ করছে। তারা ‘গুপ্ত’ থেকে বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিয়েছে। আমরা চাই প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘গুপ্ত রাজনীতি’ বন্ধ করা হোক, কারণ গুপ্ত রাজনীতি একটি সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশের জন্য প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়।
চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজ সূত্র জানায়, ক্যাম্পাসের একটি দেয়ালে লেখা ছিল ‘ছাত্ররাজনীতি ও ছাত্রলীগমুক্ত ক্যাম্পাস’। সোমবার রাতে ছাত্রদলের কয়েকজন নেতাকর্মী গ্রাফিতি থেকে ‘ছাত্র’ শব্দটি মুছে দিয়ে তার ওপরে ‘গুপ্ত’ শব্দটি লিখে দেন। এর পর থেকেই দুপক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। পরদিন মঙ্গলবার সকাল থেকেই ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের কর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়। এতে উভয় পক্ষে অনেক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি অবনতির আশঙ্কায় দুপুর ১২টার পর কলেজ কর্তৃপক্ষ অভ্যন্তরীণ ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত করে।
এদিকে এই সংঘর্ষের খবর ছড়িয়ে পড়লে ওইদিন রাতেই দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়সহ জেলা-উপজেলায় হামলার পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এনে বিক্ষোভ করেছে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির।
এ ছাড়া গতকাল বুধবার তারা বিভিন্ন ক্যাম্পাসের দেয়ালে দেয়ালে ‘গুপ্ত’ লিখে গ্রাফিতি এঁকেছে। এরই অংশ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ডাকসু ভবন, মধুর ক্যান্টিন, ডাকসু ক্যাফেটেরিয়া, সূর্যসেন হলের দেয়ালসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্থানে ‘গুপ্ত’সহ নানা গ্রাফিতি এঁকে ‘গুপ্ত রাজনীতি’ নিষিদ্ধের দাবি জানিয়েছে ছাত্রদল। এসব দেয়াল লিখনের মধ্যে রয়েছে ‘গুপ্ত যাদের অবস্থান, তাদের বাড়ি পাকিস্তান’, ‘গুপ্ত রাজনীতি চলবে না’, ‘গুপ্ত রাজনীতি নিপাত যাক’, ‘গুপ্ত রাজনীতি ও ছাত্রলীগ মুক্ত ক্যাম্পাস চাই’ ইত্যাদি।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সূর্যসেন হল ছাত্রদলের সদস্য সচিব আবিদুর রহমান বলেন, চট্টগ্রাম সিটি কলেজে ‘গুপ্ত’ রাজনীতির বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ গ্রাফিতি কর্মসূচিতে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ওপর শিবিরের ন্যক্কারজনক হামলা গণতান্ত্রিক চর্চার ওপর সরাসরি আঘাত। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দমনে সহিংসতার আশ্রয় নেওয়া তাদের দুর্বলতারই প্রমাণ। মাস্টারদা সূর্যসেন হল ছাত্রদলের ‘প্রতিবাদী দেয়াল লিখন’ কর্মসূচি এই সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, প্রতিরোধ। যে কোনো সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আগামী দিনেও আমরা আমাদের অবস্থান জানান দেব।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও ‘গুপ্ত’ লিখে গ্রাফিতি অঙ্কন করেছে শাখা ছাত্রদল। বিশ্ববিদ্যালয়টির সোহরাওয়ার্দী হলের মোড়ে ‘বিতাড়িত গুপ্ত থেকে পানাহ চাই’ এবং লাল কালিতে লেখা ‘গুপ্ত’ লেখার ওপর সাদা কালি দিয়ে কাটা দেখা যায়। এ ছাড়া প্রধান সড়কের সামনে ‘আলবদর ও গুপ্ত প্রবেশ নিষেধ’ লেখা দেখা যায়। এসব গ্রাফিতি দিয়ে ছাত্রদল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে গুপ্ত রাজনীতি বন্ধ করার দাবি জানায়।
এসব গ্রাফিতির ফলে যদি কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে—এমন প্রশ্নের জবাবে ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন হৃদয় বলেন, আমরা সব সময় মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী, যৌক্তিক রাজনীতি বিশ্বাস করি। আমরা চাই, প্রত্যেক রাজনৈতিক দল প্রকাশ্য রাজনীতি করুক। যদি কেউ গুপ্ত রাজনীতি করে এবং গুপ্ত হামলা করে, অবশ্যই বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল শক্ত হাতে প্রতিহত করবে।
এ বিষয়ে চাকসুর ভিপি ও শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি ইব্রাহীম হোসেন রনি বলেন, সৌহার্দ্যপূর্ণ একটি ক্যাম্পাস আশা করি। ওরা যদি লেখার মাধ্যমে আমাদের উসকানোর চেষ্টা করে, আমরা এগুলো থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করব।
এ ছাড়া নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েও ছাত্রদল এই গ্রাফিতি আঁকা কর্মসূচি পালন করেছে।






