স্বপ্ন প্রতিদিন ডেস্ক
১৬ মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি সরবরাহে তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে বাংলাদেশে। এর ফলে খুলনা অঞ্চলের অন্তত ৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে, যা সারাদেশে লোডশেডিংয়ের মাত্রা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। শহরাঞ্চলে ২-৩ ঘণ্টা এবং গ্রামাঞ্চলে ৩-৫ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎহীন থাকতে হচ্ছে জনগণকে।
খুলনা বিভাগে ১০টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৬টি জ্বালানির অভাবে বন্ধ রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্র ও সংবাদমাধ্যমে জানা গেছে। ফলে খুলনা শহরসহ আশপাশের এলাকায় চাহিদার তুলনায় অনেক কম বিদ্যুৎ সরবরাহ হচ্ছে। বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ভ্যাপসা গরমে এই লোডশেডিংয়ে দৈনন্দিন জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। শিল্পকারখানা, সেচ পাম্প ও গৃহস্থালির কাজ ব্যাহত হচ্ছে।
সারাদেশের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের তথ্য অনুসারে, বর্তমানে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ১৫,০০০ থেকে ১৬,৫০০ মেগাওয়াটের কাছাকাছি। কিন্তু জ্বালানি (গ্যাস, কয়লা, ডিজেল) সংকটের কারণে উৎপাদন সক্ষমতার বড় অংশ অব্যবহৃত রয়েছে।
অন্তত ৩০টিরও বেশি বিদ্যুৎকেন্দ্র বিভিন্ন কারণে (জ্বালানির অভাব, রক্ষণাবেক্ষণ, বকেয়া পাওনা) বন্ধ বা আংশিক চালু রয়েছে।
পিক আওয়ারে ১,০০০ থেকে ২,০০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত ঘাটতি দেখা দিচ্ছে, যার ফলে সারাদেশে গড়ে ২-৩ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। গ্রামাঞ্চলে এই সময় আরও বেশি—কোথাও ৪-৫ ঘণ্টা পর্যন্ত। ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে তুলনামূলক কম হলেও, শিল্পাঞ্চল ও উপশহরে সমস্যা তীব্র।
গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এয়ারকন্ডিশনার ও সেচের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সংকটের মূল কারণ:
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ (বিশেষ করে ইরান-সংশ্লিষ্ট উত্তেজনা) → জ্বালানি তেল ও গ্যাস আমদানিতে ব্যাঘাত। গ্যাস সরবরাহ হ্রাস (পাওয়ার সেক্টরে দৈনিক সরবরাহ কমে গেছে)।
কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে (রামপাল, মাতারবাড়ী, এসএস পাওয়ার ইত্যাদি) জ্বালানির অভাব। বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে চুক্তি অনিশ্চয়তা ও বকেয়া পাওনা। আমদানি নির্ভরতা (দেশের প্রায় ৯৫% জ্বালানি আমদানিকৃত)।
সরকার জ্বালানি সাশ্রয়ে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। সরকারি অফিসের সময় ৯টা থেকে ৪টা করা হয়েছে, দোকান-মার্কেট সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে বন্ধ করতে বলা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছুটি এগিয়ে আনা হয়েছে।
ডিজেলভিত্তিক কেন্দ্র বন্ধ রাখা, অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা কমানো এবং শিল্পে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে এসব পদক্ষেপ সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমছে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকট দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে যদি না বিকল্প জ্বালানি সোর্স (যেমন রাশিয়ান ডিজেল বা অন্যান্য দেশ থেকে আমদানি) নিশ্চিত করা হয়। অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়ছে—শিল্প উৎপাদন ব্যাহত, কৃষিতে সেচ সমস্যা এবং দৈনন্দিন জীবনে ভোগান্তি বাড়ছে।
জনগণের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। অনেকে বলছেন, “গরমের শুরুতেই এমন অবস্থা হলে সামনের মাসগুলোতে কী হবে?” কর্তৃপক্ষ আশা করছে, আন্তর্জাতিক বাজার স্থিতিশীল হলে এবং দ্রুত জ্বালানি আমদানি বাড়লে পরিস্থিতি উন্নতি হবে। তবে বাস্তবতা হলো—এখনই সাশ্রয়ী ব্যবহার এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া এ সংকট সহজে কাটবে না।






