‘কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পীর শামীম রেজাকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনাটি শুধু একটি ‘মব’–হিংসা নয়—এটি আমাদের সময়ের গভীর নৈতিক ও রাজনৈতিক বিপর্যয়ের নির্মম প্রকাশ।’ সোমবার (১৩ এপ্রিল) নিজের ভেরিফাইয়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে এ কথা লেখেন ভাবুক কবি ও রাষ্ট্রচিন্তক ফরহাদ মজহার। তিনি ওই পোস্টে লেখেন, “একটি পুরনো ভিডিওর ক্ষুদ্র ক্লিপ ছড়িয়ে দিয়ে, পরিকল্পিতভাবে মানুষের ভেতরের ক্রোধ, অজ্ঞতা ও ধর্মীয় আবেগকে উসকে দিয়ে এই হত্যাকাণ্ড সংগঠিত করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—কোন্ ইসলাম মানুষকে বিচার ছাড়াই হত্যা করতে শেখায়? কোন শরীয়ত বলে, না জেনে, না বুঝে, না শুনে একজন মানুষকে মেরে ফেলাই ‘ধর্মরক্ষা’?”
“বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী এটি স্পষ্ট ফৌজদারি অপরাধ।
কিন্তু তার চেয়েও গুরুতর—ইসলামের ন্যায়বোধ (ইনসাফ) অনুযায়ী এটি এক ভয়াবহ জুলুম। কোরআনের ভাষায়, ‘যে একজন মানুষকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে, সে যেন সমগ্র মানবতাকেই হত্যা করল’।” (৫:৩২) ‘যারা এই হত্যায় উসকানি দিয়েছে, যারা অংশ নিয়েছে— তাদের দায় কেবল আইনের আদালতে নয়, নৈতিক ও ঈমানি জবাবদিহিতারও। কারণ ইসলাম বিচারহীন রক্তপাতকে কখনোই বৈধতা দেয় না।’ “আজ যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে—‘ধর্ম অবমাননা’র অভিযোগ তুলে মাজার ভাঙা, মানুষ হত্যা— এটি ইসলামকে রক্ষা করা নয়, বরং ইসলামকেই অবমাননা করা। ইসলামকে সন্ত্রাস ও হিংসার ধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার যে বৈশ্বিক প্রচেষ্টা, এই ধরনের কর্মকাণ্ড তারই খাদ্য জোগায়।” “এটি নিছক ‘মবসন্ত্রাস’ বলে পাশ কাটানো যাবে না। এর পেছনে আছে একটি গভীর রাজনৈতিক প্রক্রিয়া— ইসলামকে পারলৌকিক, নিষ্ক্রিয় ও ন্যায়বিচারহীন এক ধর্মে পরিণত করা, যাতে এই পৃথিবীতে জুলুমের বিরুদ্ধে তার কোনো নৈতিক অবস্থান না থাকে।” “আমাদের মনে রাখতে হবে— কোরআন কেবল একটি মুদ্রিত কিতাব নয়; এটি একটি জীবন্ত ‘ওহি’, যা মানুষের জীবনে ন্যায় প্রতিষ্ঠার আহ্বান করে। অথচ এক শ্রেণীর আলেম ইসলামকে এমনভাবে উপস্থাপন করছেন যেন এই দুনিয়ায় ন্যায় প্রতিষ্ঠার কোনো দায়ই নাই— সব কিছু পরকালের জন্য। এই দৃষ্টিভঙ্গি ইসলামকে দুর্বল করে, আর সমাজকে অরাজকতার দিকে ঠেলে দেয়।” অন্যদিকে, সেক্যুলার পেটিবুর্জোয়া বিদ্বেষ, রাজনৈতিক সংকীর্ণতা এবং সাম্প্রতিক গণআন্দোলনের বাস্তবতা অস্বীকার— সব মিলিয়ে পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে।
“আজকের বিশ্বে যখন জায়নবাদী-সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন চলছে, যখন শক্তির রাজনীতিই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নির্ধারণ করছে— ঠিক এই সময় ইসলামকে একটি ‘হিংস্র ধর্ম’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা বাংলাদেশের অস্তিত্বের জন্যও হুমকি।” “মাজার ভাঙা, পীর-মাশায়েখদের হত্যা— এসব কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এগুলো একটি ভয়ংকর বার্তা বহন করে: এই সমাজকে ভেতর থেকে ভেঙে ফেলার বার্তা।” “বাংলাদেশের চারপাশের বাস্তবতা আমাদের সামনে স্পষ্ট— একদিকে হিন্দুত্ববাদী ভারত, অন্যদিকে গণহত্যাকারী মায়ানমার। এই প্রেক্ষাপটে নিজেদের ভেতরেই যদি আমরা ন্যায়, মানবিকতা ও সংযম হারাই— তাহলে আমাদের অস্তিত্বই প্রশ্নের মুখে পড়বে। তাই এখন সবচেয়ে জরুরি— সত্যকে জানা, ন্যায়কে প্রতিষ্ঠা করা, এবং ইসলামের নামে সহিংসতার বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া। নীরবতা এখানে নিরপেক্ষতা নয়— এটি অন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো।”