ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যাম্পাসে বৈদ্যুতিক গাড়ি নামিয়ে গ্রিন ফিউচার ফাউন্ডেশন নামের একটি সংগঠন ব্যবসা করলেও বিদ্যুতের খরচা গুনতে হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে। আর যে হারে ভাড়া নেওয়া হচ্ছে, সেটিকে ‘চড়া’ হিসেবেই দেখছেন শিক্ষার্থীরা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যুৎ শাখার তথ্য অনুযায়ী, ক্যাম্পাস এলাকায় শিক্ষার্থীদের নিরাপদ যাতায়াতের জন্য ২০২৫ সালের মে মাসে ২০টি বৈদ্যুতিক গাড়ি নামায় সংগঠনটি, যারা তখনই থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যুৎ সুবিধা নিচ্ছে। শুরুতে এ গাড়িগুলোর জন্য রেজিস্ট্রার ভবন সংলগ্ন এলাকায় চার্জের ব্যবস্থা করা হয়। পরে সেখান থেকে সরিয়ে কেন্দ্রীয় খেলার মাঠের এক কোণায় সরঞ্জাম বসিয়ে সুইমিং পুলের লাইন থেকে নেওয়া হচ্ছে বিদ্যুৎ। সুইমিং পুলের দায়িত্বে থাকা সহকারী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান বলেন, “তারা যে এখান থেকে বিদ্যুৎ নিচ্ছে, আমাকে অবহিত করে নাই। এখন আমি আমার পরিচালককে জানিয়েছিলাম, তিনি কিছু বলে নাই।” প্রকৌশল দপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী লুৎফর রহমান বলেন, “এখানে আমরা কিছুই জানি না—কোন প্রক্রিয়ায় তাদেরকে বিদ্যুৎ দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে প্রক্টর অফিস ও পরিবহন অফিস কাজ করছে।”
শাটল গাড়ির বিদ্যুৎ বিল কি বিশ্ববিদ্যালয় পাচ্ছে, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “এ মিটার সুইমিং পুলের। তাই তারা যে বিদ্যুৎ নিচ্ছে, সেটা আলাদা করে আর হিসাব হয়নি। এটার কোনো বিদ্যুৎ বিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পাওয়ার কথা না।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যুৎ কর্মীরা বলছেন, প্রতিদিন গাড়ি প্রতি গড়ে ১৫০ টাকার বিদ্যুৎ লাগে। ফলে ২০টি গাড়িতে একদিনে প্রায় ৩০০০ টাকার বিদ্যুৎ ব্যবহার হয়; যা মাসের হিসাবে দাঁড়ায় প্রায় ৯০ হাজার টাকা। এ হিসাবে গত দশ মাসে প্রায় ৯ লাখ টাকার বিদ্যুৎ ব্যবহার করেছে গ্রিন ফিউচার ফাউন্ডেশন। প্রকৌশল দপ্তরের বিদ্যুৎ বিল শাখার দায়িত্বে থাকা তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহসানুল কবির মল্লিক বলেন, “আমাকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানায়নি বিদ্যুৎ বিল নিতে। আর এটা নিয়ে প্রক্টর ও এস্টেট অফিসের একটা কমিটি আছে। তারা বলতে পারেন।” যোগাযোগ করা হলে প্রক্টর সাইফুদ্দীন আহমদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমি তাদেরকে বিদ্যুৎ দিতে বলিনি। এ বিষয়ে ইঞ্জিনিয়াররা একটা মতামত দিয়েছিল। আমার ঠিক মনে নেই। আমি খোঁজ নিচ্ছি। “আর তারা তো এখন এখানে ব্যবসা করে। তাদেরকে এখানে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার সুযোগ নেই।”
কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী সোমবার বলেন, “তারা যে বিদ্যুৎ নিচ্ছে, এটাই আমি আজকে প্রথম শুনলাম। তারা যদি অবৈধভাবে বিদ্যুৎ নিয়ে থাকে, তাদেরকে অবশ্যই তার বিল পরিশোধ করতে হবে। আমি এ বিষয়ে ইঞ্জিনিয়ারের সাথে কথা বলে ব্যবস্থা নিব।”
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আত্মপ্রকাশ করা গ্রিন ফিউচার ফাউন্ডেশন শুরুর দিকে দূষণ প্রতিরোধে কয়েকটি কার্যক্রম হাতে নিলেও এখন তেমন কার্যক্রম আর নেই। সংগঠনটির সদস্য সাইফ যাওয়াদ সামি বলেন, “২০২৪ সালের শেষের দিকে আমরা কাজ শুরু করি। ২০২৫ সালে এসে পরিবেশ অধিদপ্তর আমাদের অনুমোদন দেয়। আমরা প্রথমদিকে ক্যাম্পাস গ্রিনারি নিয়ে কাজ শুরু করেছি। পরে শাটল সার্ভিস যুক্ত হয়।” বর্তমানে পরিবেশ নিয়ে কোনো কার্যক্রম না থাকার বিষয়ে তিনি শুক্রবার বলেন, “নির্বাচনে আমাদের অনেক ভোলান্টিয়ার পর্যবেক্ষক হিসেবে কাজ করায় ব্যস্ত ছিল; তবে তারা গ্রিন ফিউচার ফাউন্ডেশন থেকে না। তাই আজ থেকে আবার কাজ শুরু করছি।”
যাত্রী কারা?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নীলক্ষেত মোড়ে শুক্রবার বিকালে এক গাড়িতে দেখা যায়, ১২ জন যাত্রীর মধ্যে আটজনই ‘বহিরাগত’, তারা সেদিন ক্যাম্পাসে ঘুরতে এসেছিলেন। সেদিন সন্ধ্যায় কার্জন হল থেকে যাত্রা শুরু করা আরেক গাড়িতে দেখা যায়, সেখানকার অর্ধেক যাত্রীই দর্শনার্থী। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আফতাব আহমেদ বলছিলেন, “এ গাড়িগুলো যখনই দেখি, সবসময় বহিরাগতরা যাতায়াত করে। অনেক সময় শিক্ষার্থীরাই চড়তে পারে না।” রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী ফয়সাল রহমান বলেন, “এ গাড়িগুলো যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরকে সেবা দিত, তাহলে ঠিক আছে। কিন্তু বহিরাগত বা দর্শনার্থীরা প্রতিদিন এসে এগুলোতে করে ঘুরে। “এতে পড়ার পরিবেশও বিঘ্নিত হচ্ছে। এগুলোর কারণে কার্জন হল আরও দিন দিন পার্কে পরিণত হচ্ছে।” বিজয় একাত্তর হলের আবাসিক শিক্ষার্থী আসিফ মুরাদ বলেন, “এ শাটলগুলো হল পাড়ায় কখনো আসে না। এখানে এত শিক্ষার্থী—এখানেই যদি না থাকে, তাহলে এগুলো কী করে? “আর বিশেষ করে এগুলোর কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। অনেক শিক্ষার্থী ক্লাসে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করেও পায় না।”
ভাড়া নিয়ে অসন্তোষ
ক্যাম্পাসে বৈদ্যুতিক শাটল সেবার ভাড়া নিয়ে সন্তুষ্ট নয় বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী। তাদের ভাষ্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের সুবিধা নিয়ে গ্রিন ফিউচার ফাউন্ডেশন পরিবহন সেবা দিলেও ভাড়া ঠিক করেছে ‘বাণিজ্যিক হারে’। রুট ভেদে ২০ থেকে ৩০ টাকা ভাড়া নেওয়ার যুক্তি দেখছেন না তারা। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিজেরাই এ ধরনের সেবা দিলে শিক্ষার্থীদের কম ভাড়া গুনতে হতো। গ্রিন ফিউচার ফাউন্ডেশনের তরফে ক্যাম্পাসে সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ভাড়া ২০ টাকার কথা জানানো হয়েছে। পলাশীর মোড় থেকে নীলক্ষেতের ভাড়া ২০ টাকা, তোরণ থেকে কার্জন হল ২০ টাকা হলেও হাই কোর্ট চত্বর গেলে ৩০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া নেওয়া হয় বলে শিক্ষার্থীদের ভাষ্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী আসিফ মুরাদ বলেন, “এ শাটলগুলো ক্যাম্পাসে ফ্রিতে বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে, গাড়িগুলো আবার এখানে রাখতেছে। এখানেই তো অনেক টাকা আসে। “কিন্তু শিক্ষার্থীরা এতে কি সুবিধা পাচ্ছে? কার্জন হল থেকে নীলক্ষেত ভাড়া ২০ টাকা। তাও সময়মত পাওয়া যায় না। এই সামান্য পথ যদি জন প্রতি ২০ টাকা ভাড়া দিতে হয়, শিক্ষার্থীদের কী লাভ?” তার ভাষ্যে, “এ শাটল বাদ দিয়ে ক্যাম্পাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু গাড়ি দিলে সেটা আরও বেশি শিক্ষার্থীদের কাজে আসবে।”
চালকরা থাকেন টিনশেডে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্রের কয়েকজন কর্মচারীর ভাষ্য, শারীরিক শিক্ষাকেন্দ্রে একসময় কক্ষ নিয়ে থাকতেন গ্রিন ফিউচার ফাউন্ডেশনের চালকরা। এখন তারা কেন্দ্রীয় মাঠের গাড়ির রাখার টিনশেডে থাকেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মচারী বলেন, “এখানে এখনো সব ড্রাইভার থাকতেন। এখন আবার গাড়ির টিনশেডে থাকেন তারা।” এ নিয়ে শারীরিক শিক্ষাকেন্দ্রের পরিচালক এস এম জাকারিয়া বলেন, “তারা একসময় প্রক্টর স্যারের অনুমতি নিয়ে এখানে থাকতেন। এখন থাকেন না।” তবে তাদের থাকার বিষয়ে কোনো সুপারিশ করেননি বলে দাবি করেন প্রক্টর সাইফুদ্দীন আহমদ। তিনি বলেন, “আমি কাউকে থাকার জন্য সুপারিশ করিনি। আমার মোবাইল টিমের কয়েকজন সদস্যকে রাখার জন্য জাকারিয়া সাহেবকে রিকোয়েস্ট করেছিলাম। তিনি তখন সেখানে ‘জায়গা নেই’ বলেছিলেন।”

চুক্তি কার স্বার্থে?
গ্রিন ফিউচার ফাউন্ডেশন বিদ্যুৎ, পার্কিং সুবিধা ও চালকদের আবাসন সুবিধা নিলেও বিশ্ববিদ্যালয়কে কোনো অর্থ দেয় না। এর পরও ভাড়ার যে হার ঠিক করা হয়েছে, তা শিক্ষার্থীবান্ধব নয় বলে অভিযোগ করেছেন খোদ শিক্ষার্থীরাই। সংগঠনটির সঙ্গে কোন প্রক্রিয়া বা মানদণ্ডে চুক্তি করা হয়েছে, এমন প্রশ্নের উত্তরে প্রক্টর সাইফুদ্দীন আহমদ বলেন, “তারা (গ্রিন ফিউচার) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ সংসদের সাথে কাজ করে। সেখান থেকে তারা শাটল নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়কে তিন মাস পরীক্ষামূলক সার্ভিস দিয়েছে। “এরপর সেটা এসএমটি (সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট টিম) মিটিংয়ে আলোচনা হওয়ার পর চুক্তি হয় এবং সেটা সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট টিম অনুমোদন করে।” ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য নিয়াজ আহমদ খানের নেতৃত্ব উপ-উপাচার্য (প্রশাসন), উপ-উপাচার্য (শিক্ষা), কোষাধ্যক্ষ ও প্রক্টরকে নিয়ে এসএমটি নামে এই কমিটি গঠন করা হয়েছিল। চুক্তির বিষয়ে জানতে সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সাড়া মেলেনি।
চুক্তির বিষয়ে এস্টেট ম্যানেজার ফাতেমা বিনতে মুস্তাফা শুক্রবার বলেন, “আমি তো মুখস্থ কিছু বলতে পারব না।” এ ধরনের চুক্তির সঙ্গে প্রক্টর থাকতে পারেন কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে সহযোগী অধ্যাপক সাইফুদ্দীন আহমদ বলেন, “এসএমটি থেকে ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা, গ্রিনারি, শৃঙ্খলা—এসব বিষয়ে একটা কমিটি করা হয়। সেখানে আমাকে আহ্বায়ক করা হয়েছে। সেই কমিটিতে ছিলাম।” চুক্তির আগে শাটল সেবা দিতে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানের জন্য কোনো বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছিল কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে প্রক্টর সাইফুদ্দীন বলেন, “আমরা তো তাদের পয়সা দিই না। তারা ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করে, এজন্য তাদের সাথে চুক্তি হয়েছে। আমরা পয়সা দিয়ে কাজ করালে বিজ্ঞপ্তি দিতাম।”
সার্বিক বিষয়ে গ্রিন ফিউচার ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খালিদ হোসেন বলেন, “আমরা তো বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে একটা চুক্তি করেছি, সেখানে আমাদেরকে প্রশাসন চার্জ স্টেশন করে দেওয়ার কথা বলা আছে। “কিন্তু বিদ্যুৎ বিল দিতে হবে কি না—এ নিয়ে কিছু বলে নাই; চিঠিও দেয় নাই। এখন এ বিষয়ে আমরা প্রশাসনের সাথে বসব।”