জেলা প্রতিনিধি
বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার নিজলাঠিমারা এলাকার একটি অন্ধকার রাত এখনো অনেকের মনে দাগ কেটে আছে। ভাইরাল হওয়া এক ভিডিওতে দেখা যায়—এক নারী ও এক পুরুষকে রশি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। পাশে কাঁদছে তিন মাস বয়সী একটি শিশু। শিশুটিকে মায়ের কোল থেকে আলাদা করে রাখা হয়েছে। দৃশ্যটি শুধু একটি ঘটনার বিবরণ নয়; এটি মানবিকতার সীমা কোথায় গিয়ে থেমে যায়, সেই প্রশ্নও তুলে দেয়। অভিযোগ উঠেছে, পরকীয়ার অভিযোগ তুলে ওই নারীকে বেঁধে নির্যাতন করা হয়।
স্থানীয়দের দেওয়া বিবরণে জানা যায়, পুরো ঘটনার তদারকিতে ছিলেন পাথরঘাটা সদর ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক ও ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. ছগির আলম।
ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এবং গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে বিষয়টি নজরে আসে পাথরঘাটা আমলি আদালতের। গত সোমবার জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. পনির শেখ স্বপ্রণোদিত হয়ে (মিসকেস) মামলা রুজুর নির্দেশ দেন। আদালতের আদেশে উল্লেখ করা হয়—ভিডিওতে এক নারী ও এক পুরুষকে রশি দিয়ে বেঁধে শারীরিক নির্যাতন করতে দেখা গেছে। বিশেষভাবে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, নারীর কোলের দুগ্ধপোষ্য শিশুকে আলাদা করে রাখা। আদালত প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে শিশু আইন, ২০১৩-এর ৭০ ধারা এবং দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারায় গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করেছেন।
পাথরঘাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে আগামী ১০ই মার্চের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ভাইরাল ভিডিও ও সংবাদপত্রের কপি সংগ্রহ করে আদালতে উপস্থাপনের কথাও বলা হয়েছে। আদালতের এই পদক্ষেপের পর আজ ৪ঠা মার্চ, বুধবার সকাল ১১টার দিকে নিজলাঠিমারা এলাকায় অভিযুক্তদের সমর্থনে একটি মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয়রা জানান, দলীয় কর্মীদের পাশাপাশি টাকা দিয়ে লোক ভাড়া করে এনে এই মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়েছে।
সেখানে দুলাল খন্দকার নামে বিএনপির এক প্রভাবশালী সমর্থক প্রকাশ্যে ওই নারীকে এলাকাছাড়া করার হুমকি দেন। একইসাথে আদালতের স্বপ্রণোদিত মামলার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন কয়েকজন। ফলে ঘটনাটি শুধু একটি নির্যাতনের অভিযোগেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং এতে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের ইঙ্গিতও সামনে এসেছে।
ভুক্তভোগীর ভাষ্য: “আমি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি”
নির্যাতনের শিকার নারী গণমাধ্যমকর্মীদের বলেন, জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে পরিকল্পিতভাবে তাকে অপরিচিত এক ব্যক্তির সঙ্গে জড়িয়ে ফাঁসানো হয়েছে। এরপর রশি দিয়ে বেঁধে মারধর করা হয়। এখন আবার প্রকাশ্যে এলাকা থেকে উৎখাতের হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
তার কণ্ঠে আতঙ্ক স্পষ্ট— “আমি চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।”
এলাকার অনেকেই এ ঘটনার নিন্দা জানিয়েছেন।
স্থানীয় সমাজ উন্নয়নকর্মী গোলাম কিবরিয়া বলেন, “এটি কোনো মগের মুল্লুক হতে পারে না। অপরাধের বিচার করার জন্য আইন ও আদালত আছে। কোনো জনপ্রতিনিধি বা তার সমর্থকদের অধিকার নেই কাউকে এলাকা ছাড়া করার।”
পাথরঘাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মংচেনলা জানান, আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী তদন্ত চলছে। ভিডিও ফুটেজ ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ভুক্তভোগী নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এলাকায় পুলিশ মোতায়েন রয়েছে বলেও তিনি জানান।
ঘটনাটির সূচনা যেভাবে
গত ১লা মার্চ রাতে নিজলাঠিমারা এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যায়—এক নারীকে রশি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে, তার তিন মাসের শিশু অবিরাম কাঁদছে। সেই কান্না যেন শুধু একটি শিশুর নয়; বরং একটি সমাজের বিবেককে প্রশ্ন করে—আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কে দিল?
এখন চোখ আদালতের দিকে। তদন্তের ফলাফল কী দাঁড়ায়, দায় কার ঘাড়ে পড়ে—তা সময়ই বলবে। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট: একজন মা ও একটি শিশুর প্রতি যে আচরণ দেখা গেছে, তা শুধু আইনি নয়, গভীর মানবিক বিচারও দাবি করে।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে পাথরঘাটা সদর ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক ও ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. ছগির আলমকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি।






