অনলাইন ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং বাড়তে থাকা ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের কৃষিপণ্য রপ্তানিতে। বিশেষ করে শাক-সবজি, ফলমূল ও হিমায়িত খাদ্য রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে রপ্তানি কমে যাওয়া, পণ্য পরিবহনের ব্যয় বৃদ্ধি, সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন—সব মিলিয়ে অস্থির সময় পার করছেন দেশের কৃষিপণ্য রপ্তানিকারকরা। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে ১৪৫টি দেশে সুগন্ধি চাল, ফল, সবজি, মাছ, মাংসের পাশাপাশি বিস্কুট, চানাচুর, নুডলস, জুস, মসলাসহ প্রায় ১৭২ ধরনের কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত পণ্য রপ্তানি হয়। এই বাজারের বড় অংশ প্রবাসী বাংলাদেশিদের ওপর নির্ভরশীল। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সেখানে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হওয়ায় চাহিদাও কমছে।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবে পটোল, কাঁকরোল, আলু, লাউ, কলা, আম, কাঁঠাল, লিচু ও জলপাই রপ্তানি হয়। এ ছাড়া পেঁয়াজজাতীয় সবজি এবং আম ও খেজুরেরও চাহিদা রয়েছে।
কাতার ও কুয়েতে কাঁঠাল, আম, হিমায়িত ফল, বাদাম ও বিভিন্ন ধরনের তাজা শাক-সবজি রপ্তানি করা হয়। জর্দান ও ইরানে তিল, কালিজিরা, সরিষা, সরিষার তেল ও পাটজাত পণ্য (বস্তা ও সুতা) রপ্তানি হয়।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও বাংলাদেশের কৃষিপণ্যের বাজার রয়েছে। যুক্তরাজ্যে লালশাক, পাটশাক, পুঁইশাক, লাউ, লাউশাক, ডাঁটাশাক, মুলা, শিম, চিচিঙ্গা, করলা, ধনেপাতা ও বরবটি রপ্তানি হয়।
ইতালি, সুইজারল্যান্ড ও জার্মানিতে বেগুন, কাঁচা মরিচ, লাউ, আনারস, আলু ও পাটজাত পণ্য যায়। ফ্রান্স ও সুইডেনে আম, কাঁঠাল, বেগুন, শিম ও লেবু রপ্তানি হয়। যুক্তরাষ্ট্রে তিল, কালিজিরা, সরিষার তেল এবং হিমায়িত মাছ ও ফলের চাহিদা রয়েছে। রাশিয়া ও বেলারুশে প্রধানত আলু ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি করা হয়।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের একই সময়ে কৃষিপণ্য রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
সাধারণত প্রতিবছর ১০০ কোটি ডলারের বেশি কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রপ্তানি হলেও চলমান পরিস্থিতিতে সেই লক্ষ্য পূরণ অনিশ্চিত বলে জানিয়েছেন রপ্তানিকারকরা।
পাওয়ার আর্ক ভেজিটেবল বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় তাজা সবজি রপ্তানিকারক একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা প্রকৌশলী বায়েজিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে তাঁদের রপ্তানি ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হচ্ছে এবং সেই সুযোগে ভারত বাজার দখল করছে।
তিনি জানান, প্রতি কেজি পণ্যে পরিবহন ও অন্যান্য খরচ দেড় থেকে দুই ডলার পর্যন্ত বেড়েছে। এতে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতা কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে ভারত তুলনামূলক কম খরচে পণ্য পরিবহন করতে পারছে। তাঁর অভিযোগ, বাংলাদেশি রপ্তানিকারকরা বিমানভাড়া নির্ধারণে এক ধরনের সিন্ডিকেটের কবলে পড়েছেন। রপ্তানিকারকদের ভাষ্য, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে পণ্য পাঠানো বড় ধরনের ধাক্কার মুখে পড়ে। আগে একটি কনটেইনার পাঠাতে যেখানে প্রায় এক হাজার ৫০০ ডলার খরচ হতো, এখন বিকল্প রুটে তা বেড়ে প্রায় ছয় হাজার ৫০০ ডলারে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে নতুন অর্ডার প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে। ইপিবির তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) পাঁচ কোটি ৭৭ লাখ ডলারের সবজি রপ্তানি হয়েছে। এর পর থেকে রপ্তানি নিম্নমুখী।
বাংলাদেশের কৃষিপণ্য রপ্তানির একটি বড় অংশ আকাশপথে হয়। যুদ্ধের কারণে অনেক বিমান সংস্থা রুট পরিবর্তন করায় জ্বালানি ব্যয় ও বীমার প্রিমিয়াম বেড়েছে, ফলে কার্গোভাড়া বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। গত কয়েক মাসে মধ্যপ্রাচ্যগামী বিমানভাড়া ২০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে বলে জানিয়েছেন রপ্তানিকারকরা।
স্মরণিকা ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী মাসুদুর রহমান বলেন, তাঁদের রপ্তানি কমে গেছে এবং বিমানভাড়া প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে। প্রতি কেজিতে অতিরিক্ত প্রায় ৬০০ টাকা গুনতে হচ্ছে। তবে ভারত তুলনামূলক কম খরচে ইউরোপে পণ্য পাঠাতে পারছে, যা বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগজনক।
যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরান, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার ও জর্দান সাময়িকভাবে আকাশসীমা বন্ধ ঘোষণা করে। নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে নিয়মিত ফ্লাইট বাতিল হচ্ছে। গতকাল সোমবার পর্যন্ত মোট ১৮টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত বাতিল ফ্লাইটের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৫৮।
ব্যবসায়ীরা জানান, মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান বাজারগুলোতে জাহাজ ভেড়াতে দেরি হচ্ছে এবং পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতা দেখা যাচ্ছে। পচনশীল পণ্য সময়মতো পৌঁছাতে না পারায় অনেক ক্ষেত্রে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, যা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির কারণ।
আমিকো অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল আশরাফ বলেন, তাঁদের রপ্তানি বন্ধ হওয়ার পথে। আগে প্রতি কেজির ভাড়া ছিল ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা, এখন তা বেড়ে ২৩০ থেকে ২৪০ টাকা হয়েছে। ফলে দুবাইয়ের ব্যবসায়ীরা এখন সৌদি আরব ও ওমান থেকে স্থানীয় পণ্য কিনছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট মোকাবেলায় মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পূর্ব এশিয়া ও ইউরোপের বাজারে নজর বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে আকাশপথে পণ্য পরিবহনে সাময়িক সরকারি ভর্তুকি এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কার্গো সেবার মান ও পরিধি বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
তবে সব বাজারে একই পরিস্থিতি নয়। সাহা ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী উত্তম কুমার সাহা বলেন, তিনি চীনে কৃষিপণ্য রপ্তানিতে কোনো সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন না। মূলত মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর রপ্তানিকারকরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বাংলাদেশের কৃষিপণ্য রপ্তানিতে তাৎক্ষণিক ধাক্কা দিয়েছে এবং দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে রপ্তানি আয়, কৃষি উৎপাদন, খাদ্য নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই চাপ বাড়বে।