অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রিজওয়ানার পক্ষে তার স্বামী দুর্নীতির অর্থ সংগ্রহ করতেন। ১৮ মাসে পরিবেশ খাতেই শুধু নয়, বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্নীতি, তদবিরের মাধ্যমে এই দম্পতি শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। উপদেষ্টার স্বামী ফ্যাসিস্টের সম্পদের পাহারাদার- উপদেষ্টা হওয়ার আগে, রিজওয়ানা হাসান বলেছিলেন, তাদের কোনো সম্পত্তি নেই। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, তাদের সম্পত্তির পরিমাণ হু হু করে বাড়ছে। যা ঘিরে রীতিমতো প্রশ্ন উঠে যাচ্ছে। এবি সিদ্দিকী যেহেতু নসরুল হামিদ বিপুর সঙ্গে একসঙ্গে একই স্কুলে পড়াশোনা করেছেন, সেই সূত্রেই হামিদ ফ্যাশনে চাকরি করতেন। ২০২৪-এর আগস্টের পর এবি সিদ্দিকী বা উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসানের স্বামী নসরুল হামিদ বিপুর নানা সম্পত্তি বেচাকেনার মধ্যস্থতা করছেন। এমনকি এই টাকা বিদেশে পাঠিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
রাজধানীর গুলশান ক্লাবের ঠিক উল্টোপাশে এক বিঘা জমির একটি প্লট আছে নসরুল হামিদের নামে। দুর্নীতি দমন কমিশন ২০২৫-এর জানুয়ারিতে বিপুর সব সম্পত্তি আদালতের মাধ্যমে ক্রোক করার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু সেই ক্রোক তালিকায় নেই এই শত কোটি টাকার সম্পদ। অনুসন্ধানে দেখা যায়, রিজওয়ানার তদবিরের কারণে দুদকের তালিকা থেকে এই জমি বাদ দেওয়া হয়। বর্তমানে বাজার মূল্য অনুযায়ী এর দাম অন্তত ২০০ কোটি টাকা। পূর্ত মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এই জমির বরাদ্দ বাতিল করে সরকারের অনুকূলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় গত আগস্টে। কিন্তু সেই উদ্যোগ ভেস্তে যায়, রিজওয়ানার হস্তক্ষেপে। পূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান রাজউক চেয়ারম্যানকে এনিয়ে আপাতত কিছু না করার মৌখিক নির্দেশ দেন। বাংলাদেশ প্রতিদিনের কাছে অন্তত তিনজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, এবি সিদ্দিকী এই জমি কেনার জন্য তাদের প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
গুলশানের মূল্যবান এই প্লটের পাশাপাশি রাজধানীর মাদানী এভিনিউর ১০০ ফুট রাস্তার পাশেও নসরুল হামিদের রয়েছে ৫ বিঘা জমি। এত বড় জায়গা একসঙ্গে কেনার মতো গ্রাহক না পাওয়ায় ছোট ব্লক আকারে বিক্রি তৎপরতা চালাচ্ছেন এবি সিদ্দিকী। নসরুল হামিদের কোম্পানি হামিদ রিয়েল এস্টেটের অঘোষিত মালিক এখন এবি সিদ্দিকী। প্রতিষ্ঠানের গুলশান অফিসের একজন কর্মকর্তা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানিয়েছেন, এবি সিদ্দিকী সপ্তাহে অন্তত দুই দিন এখানে আসেন। চেয়ারম্যানের কক্ষে বসে ব্যবসা তদারকি করেন।
হামিদ সোয়েটার লিমিটেড এই কারখানাটি এখন বিপু ও তার মালিকানাধীন থেকে চলে এসেছে উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসানের স্বামী এবি সিদ্দিকী এবং তার পুত্র আহমেদ জহির সিদ্দিকীর নামে। প্রতিষ্ঠানটির একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, কারখানা চালু রাখার জন্যই কাগজে কলমে মালিকানা বদল করা হয়েছে। কিন্তু কারখানার আসল মালিক বিপুই। পলিথিন বাণিজ্য- উপদেষ্টা হওয়ার পর রিজওয়ানা পলিথিনের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেন। শপিং মলে পলিথিন নিষিদ্ধ করা হয়। কয়েকদিন চলে অভিযান। কিন্তু তিন মাস পরই অভিযান থেমে যায়। গত নভেম্বর থেকে বাজারে আবার আগের মতোই পলিথিনের ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। এর কারণ অনুসন্ধানে দেখা যায়, পলিথিন উৎপাদকরা প্রথমে আন্দোলনের উদ্যোগ নিলেও পরে তারা উপদেষ্টার স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পলিথিন উৎপাদক কোম্পানির সংগঠন গত বছরের ডিসেম্বরে একটি পাঁচ তারকা হোটেলে সম্মেলন করে। সেই সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন রিজওয়ানার স্বামী এবি সিদ্দিকী। সমিতির কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, কোন যোগ্যতায় এবি সিদ্দিকী প্রধান অতিথি হিসেবে বিবেচিত হলেন? উত্তরে মুচকি হেসে বলেন, আপনারা তো সবই বোঝেন, তবুও প্রশ্ন করেন কেন? একাধিক সূত্র জানায়, কয়েক কোটি টাকার বিনিময়ে পলিথিন নাটক শেষ হয়। গত নভেম্বর থেকে রিজওয়ানা হাসান পলিথিন নিয়ে একটি কথা বলেননি। এই সময়ে নাটকীয়ভাবে পলিথিন অভিযান বন্ধ করে পরিবেশ অধিদপ্তর।
সাদা পাথর কেলেঙ্কারি-বড় পাথর, মাঝারি পাথর, ছোট পাথর। তার মধ্য দিয়ে পাহাড় থেকে নেমে আসা স্বচ্ছ জলধারা। সিলেটের ভোলাগঞ্জের সাদাপাথর পর্যটনকেন্দ্রের সেটাই ছিল আকর্ষণ। পর্যটকেরা গিয়ে পাথরের ওপর বসতেন, ছবি তুলতেন। কিন্তু রিজওয়ানা হাসান পরিবেশ উপদেষ্টা হওয়ার পর শুরু হয় পাথর লুটের উৎসব। এই সময় উপদেষ্টা ছিলেন নীরব। অভিযোগ আছে, গত বছরের মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত সময়ে বাধাহীন পাথর লুটের ঘটনায় সরাসরি জড়িত ছিলেন রিজওয়ানা। মে মাসে তৎকালীন জেলা প্রশাসক লিখিত চিঠি দিয়ে পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে পাথর উত্তোলন বন্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণের অনুরোধ জানিয়েছিলেন। এজন্য সেনা মোতায়েন করার জন্য মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। কিন্তু এই চিঠির কোনো জবাব দেয়নি মন্ত্রণালয়। এই নীরবতা রহস্য কী? চার মাস লুণ্ঠনের পর, অবশেষে গত আগস্টে দায়সারা গোছের একটি সংবাদ সম্মেলন করে রিজওয়ানা এর দায় চাপান রাজনৈতিক নেতাদের ওপর। সিলেটের ভোলাগঞ্জে সাদা পাথর লুটের ঘটনায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ‘দায়িত্ব’ নিলেও দায় নিতে পারবেন না বলে জানান তৎকালীন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। পরিবেশ ছাড়পত্র কেলেঙ্কারি- ইউনূস সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর এমনই বেসরকারি খাতের ওপর নেমে আসে দুর্যোগ। একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। বেকার হয় লাখ লাখ শ্রমিক। কলকারখানায় চালানো হয় মব সন্ত্রাস। অগ্নিসংযোগ, লুটপাট করা হয় শত শত কারখানা। এর মধ্যে মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়ায় পরিবেশ ছাড়পত্র। পরিবেশ আইন অনুযায়ী, যেকোনো কলকারখানা চালু করতে হলে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেওয়া বাধ্যতামূলক। রিজওয়ানার রাজত্বে ঘুষ ছাড়া পরিবেশ ছাড়পত্র পাওয়া যেত না। পরিবেশ অধিদপ্তরে যোগাযোগ করলে জানা যায়, রিজওয়ানা উপদেষ্টা হওয়ার পর পরিবেশ ছাড়পত্র দেওয়ার অঘোষিত কর্তৃপক্ষ ছিল এবি সিদ্দিকী। পরিবেশ ছাড়পত্রের আবেদন করলেই তাদের পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে পরামর্শ দেওয়া হতো, উপদেষ্টার স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে। দরদামে সমঝোতা হলেই মিলতো ছাড়পত্র। বন সংরক্ষক নিয়োগ বাণিজ্য- বন অধিদপ্তরে কিছু বন সংরক্ষক লাভজনক পদ রয়েছে। প্রধান বন সংরক্ষক পদের জন্য ২০/২৫ কোটি টাকার লেনদেন হয়। অন্তর্র্বর্তী সরকারের আমলে বন অধিদপ্তরের পদায়ন হতো সরাসরি এবি সিদ্দিকীর মাধ্যমে। পদায়ন বাণিজ্য করে রিজওয়ানা-এবি সিদ্দিকী জুটি শত কোটি টাকার বাণিজ্য করেছে বলে মনে করেন বন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। টেন্ডার ছাড়াই কাজ প্রদান-রিজওয়ানা পরিবেশ উপদেষ্টা হওয়ার পর সরকারি আইন কানুন ও নিয়মনীতির তোয়াক্কা করতেন না। সরকারি ক্রয় বিধি লঙ্ঘন করে নিজের ঘনিষ্ঠজনদের দিয়েছেন কোটি কোটি টাকার কাজ। পরিবেশ অধিদপ্তরের নথিপত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, দেড় বছরে অন্তত তিনশো কোটি টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে বিনা টেন্ডারে। এটা সুস্পষ্ট দুর্নীতি। বিশেষ করে, পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রচারণার কাজ দেওয়া হয়েছিল রিজওয়ানার ঘনিষ্ঠ এক বন্ধুকে। শব্দ দূষণ এবং বায়ু দূষণের প্রচারণা না করেই ঐ ব্যক্তি পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে টাকা উত্তোলন করেছিলেন। পরিবেশ অধিদপ্তরের বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের একজন কর্মকর্তা বলেন, প্রথমে বিল দিতে অস্বীকার করেন, কিন্তু পরবর্তীতে রিজওয়ানা নিজে মহাপরিচালককে টেলিফোন করে বিল পরিশোধের নির্দেশ দেন। হিসাব বিভাগের নথিতে উপদেষ্টা মহোদয়ের নির্দেশে বিল পরিশোধ করা হলো- উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিবেশ মন্ত্রণালয়ে কেনাকাটায় দুর্নীতি-পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের কাজেও অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। পরিবেশ মন্ত্রণালয় থেকে গবেষণার নামে শত কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছে। বাস্তবে কোনো গবেষণাই হয়নি। এমনকি পুরোনা গবেষণা নতুন গবেষণা হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার নজিরও রয়েছে। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ে হাওড় ও হাকালুকি নিয়ে গবেষণা আগেই আই ইউ সি এনের করা। এভাবেই গবেষণার নামে অর্থ আত্মসাৎ করেছেন রিজওয়ানা।
ইটভাটায় ঘুষ বাণিজ্য-ইটভাটা নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র এবং লাইসেন্স বাধ্যতামূলক। রিজওয়ানা ইটভাটার লাইসেন্স প্রদানের ক্ষমতা সম্পূর্ণ নিজের হাতে নেন। তাদেরকেই লাইসেন্স দেয়া হয় যারা এবি সিদ্দিকীর সংগে যোগাযোগ করে তাকে সন্তুষ্ট করতে পেরেছিল। ফলে, গত দেড় বছর ইটভাটার অনিয়ম বন্ধ হয়নি, বরং বেড়েছে।
সেন্টমার্টিন কেলেঙ্কারি- রিজওয়ানা হাসান উপদেষ্টা হওয়ার পর থেকেই সেন্টমার্টিন নিয়ে শুরু করেন ষড়যন্ত্র। একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সেন্টমার্টিন বিদেশিদের কাছে বিকিয়ে দেয়ার এজেন্ডা বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করেন সাবেক এই উপদেষ্টা। এজন্যই নয়মাস সেন্টমার্টিনে সাধারণ পর্যটকদের যাতায়াত নিষিদ্ধ করেন। রিজওয়ানার কারণে সেন্টমার্টিনে পরিবেশগত কোন উন্নতি না হলেও এই দ্বীপটির সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়ে। এভাবে দুর্নীতি অব্যাহত রাখার জন্যই নির্বাচনের বিরুদ্ধে ছিলেন রিজওয়ানা। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বিরোধীদলের পক্ষ থেকে রিজওয়ানা হাসানের বিরুদ্ধে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অভিযোগ আনা হয়। তাকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেওয়ার দাবি জানিয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল।
সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন