স্বপ্ন প্রতিদিন রিপোর্ট
সীমান্তের কাঁটাতার কি শুধু ভূখণ্ডই ভাগ করে? নাকি ভাগ করে দেয় প্রাণ আর প্রিয়জনের শেষ স্পর্শকেও? সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ সীমান্তের ওপারে গত চার দিন ধরে পড়ে থাকা সাদ্দাম হোসেনের নিথর দেহটি আজ সেই প্রশ্নই তুলছে বারবার। ওপারে পড়ে আছে একটি প্রাণহীন শরীর, আর এপারে থমকে আছে একটি পরিবারের আর্তনাদ।
অন্ধকারের সেই যাত্রা: গত বুধবার, ১লা এপ্রিল ঘর থেকে বেরিয়েছিলেন কোম্পানীগঞ্জের লামাগ্রামের যুবক সাদ্দাম। সাথে ছিল আরও তিন বন্ধু। পরিবারের কেউ জানতেন না, এই যাত্রাই হবে সাদ্দামের শেষ যাত্রা। শুক্রবার রাতে যখন সঙ্গী আবু বক্কর ফিরে এসে খবর দিলেন, তখন জানা গেল—সাদ্দাম আর নেই। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর গুলিতে বিদেশের মাটিতেই থেমে গেছে তার জীবনের স্পন্দন।
মরদেহের জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষা: একজন ভাইয়ের কাছে তার ভাই নিখোঁজ হওয়ার খবর যতটা যন্ত্রণার, তার চেয়েও বেশি কষ্টের হলো ভাইয়ের মরদেহটি চোখের সামনে থেকেও ছুঁতে না পারা। সাদ্দামের বড় ভাই নিজাম উদ্দিন জানান: “আমরা ভেবেছিলাম সাদ্দাম হয়তো কোনো আত্মীয়ের বাসায় আছে। কিন্তু এখন শুনছি তার কোমর আর পায়ে গুলি করা হয়েছে। চার দিন হয়ে গেল, ওখানেই পড়ে আছে আমার ভাইটা। আমরা কি শেষবারের মতো তাকে দেখতে পাব না?”
প্রশাসনের দৌড়ঝাঁপ ও অনিশ্চয়তা: ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয় বিজিবি এবং পুলিশের মধ্যে তৎপড়তা শুরু হলেও এখনো মেলেনি চূড়ান্ত কোনো সমাধান।
বিজিবি’র অবস্থান: সিলেট বিজিবি-৪৮ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. নাজমুল হক জানিয়েছেন, তারা বিএসএফ-এর কাছে নির্দিষ্ট করে জানতে চেয়েছেন। কিন্তু ওপার থেকে এখনো কোনো মরদেহের অস্তিত্ব স্বীকার করা হয়নি।
পুলিশের ভূমিকা: কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, বিষয়টি সীমান্ত সংক্রান্ত জটিল হওয়ায় মরদেহ হস্তান্তরের আগে তাদের আইনিভাবে কিছু করার নেই। তবে মরদেহ ফেরত আসলে তারা দ্রুত ব্যবস্থা নেবেন।
একটি লাশের রাজনীতি ও মানবিকতা: সীমান্তে গুলি আর লাশের মিছিল নতুন কিছু নয়, কিন্তু সাদ্দামের এই ঘটনাটি আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে সীমান্ত ব্যবস্থাপনার সেই পুরোনো ক্ষতকে। একদিকে বিজিবির সচেতনতামূলক আহ্বান—”অবৈধভাবে সীমান্ত পাড়ি দেবেন না”, আর অন্যদিকে দারিদ্র্য বা অন্য কোনো প্ররোচনায় জীবনের ঝুঁকি নেওয়া একদল যুবক।
সাদ্দামের পরিবার এখন কোনো বিচার চায় না, তারা চায় শুধু মাটি দেওয়ার অধিকার। একটি লাশ কি তবে দুই দেশের সীমান্ত রেখার মারপ্যাঁচে এভাবেই পড়ে থাকবে?






