স্বপ্ন প্রতিদিন ডেস্ক
হামের পর এবার জলাতঙ্ক — ইউনিসেফ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মত প্রতিষ্ঠানগুলোর সতর্কতা উপেক্ষা করে ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার শেখ হাসিনা সরকারের গৃহীত স্বাস্থ্য খাতের ৫ বছর মেয়াদি অপারেশনাল প্ল্যান বা ওপি স্থগিত করার পর একের পর এক টিকা সংকটে জর্জরিত দেশের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা। সারাদেশে একই চিত্র: হাসপাতালে এসে টিকা না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন আহত মানুষ, আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন অনেকে।
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং তার স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের অযোগ্যতা, অদক্ষতা, অব্যবস্থাপনা এবং হঠকারিতাকে দুষছেন ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ। দেশের স্বাস্থ্যখাতকে ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে’ চরম বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে ‘ইউনূরজাহান’ গং- এমন কথা এখন প্রকাশ্যেই বলছেন সাধারণ মানুষ।
তিন দিন আগে পোষা বিড়ালের আঁচড়ে আহত হয় ৬ বছরের শিশু অর্পিতা। পরদিন তাকে নিয়ে খুলনা জেনারেল হাসপাতালে আসেন মা সেলিনা হোসেন। উদ্দেশ্য ছিল জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকা নেওয়া। কিন্তু হাসপাতালে গিয়ে দেখেন, শতাধিক মানুষের ভিড় থাকলেও সরকারি সরবরাহে কোনো টিকা নেই।
সেলিনা বলেন, “বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে ৮০০ টাকা দিয়ে ভ্যাকসিন কিনে হাসপাতালে এনে মেয়েকে টিকা দিতে হয়েছে।”
বগুড়ার চিত্র আরও উদ্বেগজনক। দুই মাস আগে রাস্তার কুকুরকে খাওয়াতে গিয়ে গায়ে আঁচড় লাগে রোকসানা বেগমের। তিনি প্রথমে বগুড়া মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে যান, সেখানে টিকা না থাকায় তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। পরে জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হন তিনি।
রোকসানা বলেন, “দুই হাসপাতালে ঘুরেও টিকা পাইনি। ২৪ ঘণ্টা পার হয়ে যাওয়ার পর আর কোথাও যাইনি। এখন আতঙ্কে আছি — কখন কী হয়।”
পরিস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, “এখন অনেক পরিবারেই পোষা প্রাণী আছে। কামড় বা আঁচড়ের পর টিকা জরুরি। কিন্তু সরকারের সরবরাহ বন্ধ থাকায় মানুষ ঝুঁকিতে পড়ছে।”
জলাতঙ্কের টিকা মূলত কুকুর বা বিড়ালের কামড় কিংবা আঁচড়ের পর দেওয়া হয়। আগে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে এই টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করা হতো। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শেখ হাসিনা সরকারের গৃহীত ৫ বছর মেয়াদি স্বাস্থ্য খাত কর্মসূচি ও এর অপারেশনাল প্ল্যান বা ওপি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রায় এক বছর ধরে সেই কার্যক্রম ব্যাহত হয়ে পড়েছে।
এর আগে হামের টিকার সংকট দেখা দিয়েছিল, এখন একই পরিণতি হয়েছে জলাতঙ্কের টিকারও। কেন্দ্রীয় সংগ্রহ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন তুলনামূলক ধীরগতির বার্ষিক ক্রয় প্রক্রিয়া ও হাসপাতালভিত্তিক আংশিক সংগ্রহের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
এরইমাঝে চার দশক আগে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া গুটিবসন্তে আক্রান্ত হয়েছে গাইবান্ধার একটি পরিবার। পরিবারের কর্তা স্কুল শিক্ষক মারা গেছেন রোগের উপসর্গ নিয়ে। পরিবারের আরও চার সদস্য একই উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন।
ওপি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর একে একে বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিচ্ছে। অথচ নেই কোনো ভ্যাকসিন বা টিকা।
নওগাঁ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, রাজশাহী ও বরিশালসহ বিভিন্ন জেলায় একই ধরনের পরিস্থিতির খবর পাওয়া গেছে। কোথাও কিছু টিকা থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।
বগুড়ার সিভিল সার্জন ডা. মো. খুরশীদ আলম জানান, “মাসখানেক আগেও জলাতঙ্কের ভ্যাকসিনের তীব্র সংকট ছিল। তবে ১৫ দিন আগে সরকারি সিদ্ধান্তে হাসপাতালগুলোকে নিজস্ব তহবিল থেকে সীমিত পরিমাণে টিকা কেনার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকার টিকা কেনা যাচ্ছে, কিন্তু এটি প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম।”
নওগাঁ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক ডা. মীর সুফিয়ান বলেন, “যা আছে তা দিয়ে আপাতত চলছে। তবে এটি মোটেও যথেষ্ট নয়।”
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত জলাতঙ্কের টিকার সরবরাহ গত এক মাস ধরে বন্ধ। এ কারণে কিছু দিন রোগীদের টিকা দেওয়াও সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল। বর্তমানে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ স্থানীয়ভাবে টিকা কিনে রোগীদের সেবা দিচ্ছে।
বরিশালের সিভিল সার্জন ডা. এস এম মনজুর-এ-এলাহী বলেন, “প্রায় চার মাস ধরে র্যাবিস ভ্যাকসিনের সংকট চলছে। এখন অপারেশনাল প্ল্যান না থাকায় নিজেদেরই ভ্যাকসিন কিনতে হচ্ছে। আজই ইনসেপ্টা ফার্মার সঙ্গে কথা বলেছি। তারা জানিয়েছে, আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে ভ্যাকসিন সরবরাহ করতে পারবে। তখন সংকট কেটে যাবে বলে আশা করছি।”
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ এই পরিস্থিতিকে “হঠকারী সিদ্ধান্তের পরিণাম” বলে অভিহিত করেছেন।
তিনি বলেন, “দেশের জনস্বাস্থ্যবিষয়ক কর্মসূচিতে অপারেশনাল প্ল্যানের অনেক সাফল্য রয়েছে। এটি বন্ধ করে দেওয়া ছিল হঠকারী সিদ্ধান্ত। জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘদিন ধরে কাজ চলছিল।”
তিনি আরও বলেন, “ফোর্থ সেক্টর প্রোগ্রামে মানুষ ও কুকুরের টিকাদানে ৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার ব্যয় করা হয়। ওই প্রকল্পের আওতায় দুই দফা কুকুরকে টিকা দেওয়া হয়েছিল। এতে জলাতঙ্কে মৃত্যুহার ৯০ শতাংশের বেশি কমে আসে। এখন এসব কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আগের বিনিয়োগ কার্যত বিফলে গেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে জলাতঙ্ক নির্মূলের লক্ষ্য এখন অসম্ভব হয়ে পড়েছে।”
ডা. বেনজির আরও জানান, দেশে প্রতি বছর প্রায় ৫ থেকে ৬ লাখ মানুষ কুকুর, বিড়ালসহ বিভিন্ন প্রাণীর কামড়ে আক্রান্ত হন। আগে কেন্দ্রীয়ভাবে টিকা সংগ্রহ করা হতো বলে সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত করা যেত। এখন বার্ষিক ক্রয় প্রক্রিয়ায় জুলাই মাসে কেনা শুরু হলেও টিকা হাতে পেতে তিন থেকে চার মাস সময় লেগে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা আরও সতর্ক করছেন যে, জলাতঙ্ক নির্মূলের পথে বড় বাধা হয়ে উঠেছে কুকুরের টিকাদান কার্যক্রমে স্থবিরতা। দেশে আনুমানিক ১৬ থেকে ১৭ লাখ কুকুর রয়েছে, যাদের কমপক্ষে তিন দফা টিকা দেওয়া প্রয়োজন। এই কার্যক্রম থমকে যাওয়া মানে মানুষের ঝুঁকি আবার বেড়ে যাওয়া।
এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ডা. হালিমুর রশিদ জানান, এখন থেকে কুকুরের টিকাদান কার্যক্রম স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বদলে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় পরিচালনা করবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর টিকা সংগ্রহ পরিকল্পনায় পরিবর্তন এনে ইউনিসেফের মাধ্যমে সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সরকার ইতোমধ্যে ১০ ধরনের ৯ কোটি ৫০ লাখ ডোজ টিকা সংগ্রহে ৮ কোটি ৩৬ লাখ ডলার ছাড় করেছে। পাশাপাশি আরও ৩ কোটি ৫০ লাখ ডলারের টিকা সংগ্রহ পরিকল্পনা এবং ১৫ মাসের বাফার স্টক কৌশল বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। আগামী ৮ থেকে ১২ মাসের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করছে সরকার।
জলাতঙ্কের টিকা সংকট নিরসনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ডা. মো. হালিমুর রশিদ জানান, ৯ লাখ ডোজ জলাতঙ্কের টিকা কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এবং আগামী ১৫ দিনের মধ্যে সংকট অনেকটাই কেটে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এদিকে ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে জরুরি পদক্ষেপের পর হামের টিকার সরবরাহ কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. এফ এ আসমা খান জানান, বর্তমানে প্রতিদিন ১,২০০ থেকে ১,৪০০ রোগীকে টিকা দেওয়া হচ্ছে এবং হাসপাতালটিতে ৩০০টির বেশি ভায়াল সরবরাহ করা হয়েছে।
তবে মৃত্যু থামছে না। গত মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত মাত্র ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামসদৃশ উপসর্গে আরও সাতটি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত ১৫ই মার্চ থেকে এ পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩২৪ জনে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকা সরবরাহ ব্যবস্থায় কাঠামোগত সমস্যার সমাধান না হলে — এবং জরুরি ভিত্তিতে জলাতঙ্কসহ অন্যান্য রোগের টিকাদান কার্যক্রম পুনরুজ্জীবিত না হলে — দশকের পর দশকের অর্জন নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।






