বিশেষ প্রতিবেদক
ঢাকা, ১২ মার্চ ২০২৬: যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি অফিস (USTR) গত ১১ মার্চ ঘোষণা করেছে যে, সেকশন ৩০১ এর অধীনে ১৬টি বড় বাণিজ্য অংশীদার দেশের বিরুদ্ধে নতুন তদন্ত শুরু হয়েছে। এই তালিকায় বাংলাদেশ, ভারত, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মেক্সিকো, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর, তাইওয়ান, সুইজারল্যান্ড ও নরওয়ের নাম রয়েছে।
USTR-এর প্রধান জেমিসন গ্রিয়ার জানিয়েছেন, এই তদন্তের মূল ফোকাস হলো স্ট্রাকচারাল এক্সেস ক্যাপাসিটি (structural excess capacity) এবং উৎপাদনের অতিরিক্ততা, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদন খাত ও কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তদন্তে যদি কোনো দেশের নীতি বা চর্চাকে অন্যায্য (unreasonable or discriminatory) বলে প্রমাণিত হয়, তাহলে সেই দেশের পণ্যের ওপর নতুন শুল্ক আরোপ করা হতে পারে—এমনকি এই গ্রীষ্মের মধ্যেই।
এই পদক্ষেপ আসছে গত মাসে (ফেব্রুয়ারি ২০২৬) মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ের পর, যেখানে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগের কিছু শুল্কনীতি (বিশেষ করে IEEPA-ভিত্তিক ট্যারিফ) অবৈধ বলে ঘোষণা করা হয়। এর ফলে ট্রাম্প প্রশাসন সেকশন ৩০১-এর মাধ্যমে নতুন করে শুল্কের চাপ তৈরি করার চেষ্টা করছে।
গ্রিয়ার বলেন, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে আরোপিত অস্থায়ী শুল্ক জুলাইয়ে শেষ হওয়ার কথা, তার আগেই এই তদন্ত শেষ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তদন্ত শুরুর পর ১৭ মার্চ থেকে পাবলিক কমেন্টের জন্য ডকেট খোলা হবে, এবং মে মাসে পাবলিক হিয়ারিং হবে।
বাংলাদেশের জন্য আশঙ্কার বিষয়সমূহ
বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত রপ্তানি-নির্ভর, বিশেষ করে তৈরি পোশাক (RMG) খাত যা যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বড় বাজার। এই তদন্তে বাংলাদেশের নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় নিম্নলিখিত ঝুঁকি দেখা দিচ্ছে:
নতুন শুল্ক আরোপের সম্ভাবনা:
যদি USTR বাংলাদেশের উৎপাদন নীতি বা রপ্তানি সুবিধাকে “অন্যায্য” বলে মনে করে (যেমন: সাবসিডি, সস্তা শ্রম, বা বড় ট্রেড সারপ্লাস), তাহলে RMG-সহ অন্যান্য পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ হতে পারে। এতে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা কমে যাবে, রপ্তানি হ্রাস পাবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয় কমবে।
বিদ্যমান চুক্তির অস্থিরতা:
২০২৬ সালের শুরুতে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত রেসিপ্রোকাল ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট অনুসারে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ১৯% রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ নির্ধারিত হয়েছে (কিছু পোশাকের জন্য শূন্য ট্যারিফের সুবিধা), কিন্তু এই নতুন তদন্ত সেই চুক্তিকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে বা অতিরিক্ত শুল্ক যোগ করতে পারে।
অর্থনৈতিক প্রভাব:
RMG খাতে কর্মসংস্থান (প্রায় ৪০ লাখ মানুষ) এবং জিডিপির বড় অংশ (প্রায় ৮০% রপ্তানি) ঝুঁকিতে পড়তে পারে। রপ্তানি কমলে ব্যাংকিং সেক্টর, শিল্পায়ন এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
ভূ-রাজনৈতিক চাপ:
তদন্তের পাশাপাশি USTR আরেকটি সেকশন ৩০১ তদন্ত শুরু করছে জোরপূর্বক শ্রম (forced labor) নিয়ে, যা ৬০টিরও বেশি দেশকে কভার করবে। বাংলাদেশের RMG খাতে শ্রম অধিকার নিয়ে আগের অভিযোগ থাকায় এটি অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে শুল্ক বাড়লে ইউরোপ বা অন্যান্য বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে, কিন্তু সেখানেও নতুন বাধা আসতে পারে। বাংলাদেশ সরকার এখনও এই তদন্ত নিয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি, তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে দ্রুত কনসালটেশন, পাবলিক কমেন্ট জমা এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করা দরকার। এই ঘটনা বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় রপ্তানি কৌশল এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাকে আরও জোরালো করে তুলেছে।






