বিশ্বের প্রধান আর্থিক বাজারগুলোতে টানা দরপতনের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রস্তাবিত বাণিজ্য সমঝোতার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা সাম্প্রতিক বাণিজ্য চুক্তিটি আপাতত অনুমোদনের তালিকা থেকে সরিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে ইউরোপীয় আইনপ্রণেতারা। ফ্রান্সের স্ট্রাসবুর্গে অনুষ্ঠিতব্য অধিবেশনে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে। এই সিদ্ধান্তের পেছনে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন বড় ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এবং শুল্ক আরোপের হুমকিকে ইউরোপের নীতিনির্ধারকেরা চাপ প্রয়োগের কৌশল হিসেবে দেখছেন। ফলে দুই অর্থনৈতিক জোটের মধ্যে সম্প্রতি যে সমঝোতার পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, তা আবারও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
বাণিজ্য সম্পর্ক নিয়ে অনিশ্চয়তার প্রভাব সরাসরি পড়েছে শেয়ারবাজারে। ইউরোপের প্রধান সূচকগুলোতে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো বড় পতন দেখা গেছে। একই চিত্র দেখা যায় যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও, যেখানে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি এড়িয়ে চলায় বড় সূচকগুলো উল্লেখযোগ্যভাবে নেমে গেছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সম্ভাব্য বাণিজ্য সংঘাতের আশঙ্কা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
মুদ্রাবাজারেও অস্থিরতা স্পষ্ট। ডলারের মান কমার বিপরীতে ইউরোপীয় মুদ্রা ইউরো ও ব্রিটিশ পাউন্ড স্বল্প সময়ের জন্য শক্তিশালী হলেও দিন শেষে সীমিত লাভে স্থির হয়। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যের দীর্ঘমেয়াদি সরকারি বন্ডে বিক্রির চাপ বেড়ে যাওয়ায় ঋণের সুদের হারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।
এর আগে গত গ্রীষ্মে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে একটি বাণিজ্য সমঝোতায় পৌঁছানো হয়, যার লক্ষ্য ছিল পারস্পরিক শুল্ক কমানো এবং বিনিয়োগ ও রপ্তানি বাড়ানো। সেই সমঝোতায় ইউরোপীয় পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত উচ্চ শুল্ক উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে কার্যকর হওয়ার জন্য ইউরোপীয় পার্লামেন্টের চূড়ান্ত অনুমোদন প্রয়োজন হওয়ায় বিষয়টি এখনও ঝুলে রয়েছে।
ইউরোপীয় পার্লামেন্টের কয়েকজন প্রভাবশালী সদস্য ইতোমধ্যে স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় চুক্তিটি এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। তাদের মতে, কোনো সদস্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব নিয়ে হুমকি বা অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ চলতে থাকলে সে অবস্থায় বাণিজ্য সহযোগিতা অব্যাহত রাখা যুক্তিসংগত হবে না।
এই পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন আবারও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পাল্টা বাণিজ্য ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বিবেচনা করছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতির জবাবে বিপুল অঙ্কের মার্কিন পণ্যের ওপর সম্ভাব্য শুল্কের তালিকা প্রস্তুত থাকলেও আলোচনার কারণে তা স্থগিত রাখা হয়েছিল। তবে নির্ধারিত সময়সীমা শেষের দিকে আসায় সেই পরিকল্পনা আবার সামনে চলে এসেছে।
ফ্রান্সসহ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশের নেতৃত্ব ইউরোপীয় ইউনিয়নকে আরও দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে। তাদের মতে, বাণিজ্য নীতিকে রাজনৈতিক চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হলে তা ইউরোপের জন্য গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
অন্যদিকে ওয়াশিংটন থেকে ইউরোপকে সংযম দেখানোর বার্তা দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা সতর্ক করে জানিয়েছেন, ইউরোপ যদি প্রতিক্রিয়ামূলক ব্যবস্থা নেয়, তবে তার জবাব দেওয়া হবে। তবে একই সঙ্গে তারা আলোচনার পথ খোলা রাখার আহ্বানও জানিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের দুই বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদারের মধ্যে এই টানাপোড়েন দীর্ঘস্থায়ী হলে বৈশ্বিক অর্থনীতি, বাণিজ্য প্রবাহ এবং বিনিয়োগ পরিবেশে আরও চাপ সৃষ্টি হতে পারে।