ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ক্রমেই তীব্র আকার ধারণ করার মধ্যে দেশটির সেনাবাহিনী ঘোষণা দিয়েছে, তারা যে কোনো পরিস্থিতিতে দেশের “জাতীয় স্বার্থ” রক্ষা করবে। এ সময় ব্যাপক গ্রেপ্তার অভিযান চলছে এবং ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
শনিবার আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে ইরানের সেনাবাহিনী অভিযোগ করে, ইসরায়েল ও “শত্রুভাবাপন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী” ইরানের জননিরাপত্তা বিনষ্ট করার চেষ্টা করছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, “সর্বাধিনায়ক (সুপ্রিম লিডার)-এর নির্দেশনায় ইরানের সেনাবাহিনী অন্যান্য সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে শত্রুপক্ষের আঞ্চলিক তৎপরতা পর্যবেক্ষণ করছে। একই সঙ্গে আমরা দৃঢ়ভাবে দেশের জাতীয় স্বার্থ, কৌশলগত অবকাঠামো এবং জনগণের সম্পদ রক্ষা করব।”
এই হুঁশিয়ারি আসে এমন এক সময়ে, যখন তেহরান সরকার সাম্প্রতিক বছরগুলোর সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ দমন করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। লাগামছাড়া মূল্যস্ফীতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে হাজার হাজার মানুষ রাজপথে নেমেছে।
বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন শহরে
শনিবার আবারও ইরানের রাজধানী তেহরানের উত্তরাঞ্চলে বিক্ষোভ হয়। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি যাচাই করা ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, বিক্ষোভকারীরা আতশবাজি ফাটান, হাঁড়ি-পাতিল পেটান এবং ক্ষমতাচ্যুত রাজতন্ত্রের পক্ষে স্লোগান দেন।
যেসব ভিডিও তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি, সেগুলোতে উত্তরাঞ্চলের রাস্তা, উত্তর-পশ্চিমের তাবরিজ এবং দক্ষিণের শিরাজ ও কেরমান শহরেও সমাবেশের দৃশ্য দেখা যায়।
গত ডিসেম্বরের শেষ দিক থেকে ইরানের বিভিন্ন প্রান্তে এই বিক্ষোভ চলছে। অনেক জায়গায় বিক্ষোভকারীরা ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে দেশ পরিচালনা করে আসা ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার অবসানের দাবিও তুলছেন।
মানবাধিকার উদ্বেগ ও গণগ্রেপ্তার
মানবাধিকার সংগঠনগুলো সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে। কারণ বিক্ষোভ ঘিরে হতাহত ও ব্যাপক গ্রেপ্তারের খবর পাওয়া যাচ্ছে।
নরওয়ে-ভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা Iran Human Rights জানিয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ৫১ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে নয়জন শিশু রয়েছে। আহত হয়েছেন আরও শত শত মানুষ।
এদিকে ইরানের তাসনিম সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, শনিবার পর্যন্ত অন্তত ২০০ জন “দাঙ্গার নেতৃত্বদানকারী” ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ইরানি কর্তৃপক্ষের আরোপ করা সার্বিক ইন্টারনেট বন্ধ-এর তীব্র সমালোচনা করেছে। সংস্থাটি বলেছে, এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য হলো— “বিক্ষোভ দমনের নামে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে সংঘটিত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ও অপরাধের প্রকৃত চিত্র আড়াল করা।”
‘খোদার শত্রু’ আখ্যা ও মৃত্যুদণ্ডের হুঁশিয়ারি
ইরানের অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ মোভাহেদি আজাদ শনিবার সতর্ক করে বলেন, যারা বিক্ষোভে অংশ নেবে, তাদের ‘খোদার শত্রু’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের বরাতে জানানো হয়, এই অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।
এদিকে সেনাবাহিনীর বাইরে আলাদাভাবে পরিচালিত ইরানের অভিজাত বাহিনী ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের অর্জন ও দেশের নিরাপত্তা রক্ষা করা তাদের কাছে একটি “লাল রেখা”।
যুক্তরাষ্ট্র–ইরান পাল্টাপাল্টি বক্তব্য
এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও ইরানি বিক্ষোভকারীদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, “ওয়াশিংটন সহায়তা করতে প্রস্তুত।”
এর এক দিন আগে তিনি ইরানের কর্তৃপক্ষকে বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়ন চালানো থেকে সতর্ক করে বলেন, “আগের মতো যদি তারা মানুষ হত্যা শুরু করে, তাহলে আমরা হস্তক্ষেপ করব।”
ট্রাম্প স্পষ্ট করেন, “এর অর্থ মাটিতে সেনা নামানো নয়, কিন্তু এমনভাবে আঘাত করা হবে—যেখানে সবচেয়ে বেশি ব্যথা লাগে।”
ইরানের ক্ষমতাচ্যুত শাহের পুত্র রেজা পাহলভিও ইরানিদের আরও লক্ষ্যভিত্তিক বিক্ষোভে নামার আহ্বান জানিয়েছেন। সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, “এখন শুধু রাস্তায় নামা নয়, শহরের কেন্দ্র দখল করা এবং তা ধরে রাখার প্রস্তুতি নেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।”
তিনি শনিবার ও রোববার আরও বিক্ষোভের ডাক দেন।
খামেনির কড়া ভাষা
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বিক্ষোভকারীদের “ভাঙচুরকারী” বলে আখ্যা দিয়েছেন।
রাষ্ট্রীয় চ্যানেল প্রেস টিভিতে প্রচারিত এক ভাষণে তিনি বলেন, “ট্রাম্পের হাত হাজারের বেশি ইরানির রক্তে রঞ্জিত”—যা জুন মাসে ইরানে ইসরায়েলের হামলার প্রতি ইঙ্গিত, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন ও সরাসরি হামলায় অংশ নেয়।
খামেনি বলেন, “অহংকারী মার্কিন প্রেসিডেন্টও একদিন উৎখাত হবে—ঠিক যেমন ১৯৭৯ সালের বিপ্লবে ইরানের রাজতন্ত্র উৎখাত হয়েছিল।”
তিনি আরও বলেন, “ইসলামী প্রজাতন্ত্র লক্ষ লক্ষ সম্মানিত মানুষের রক্তের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। নাশকতাকারীদের কাছে এটি কখনো মাথা নত করবে না।”
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন যে তারা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকে ইচ্ছাকৃতভাবে সহিংস ও বিভাজনমূলক করতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর এই অভিযোগকে “অবাস্তব কল্পনা” বলে উড়িয়ে দিয়েছে।
মূল কারণ ও ভবিষ্যৎ আশঙ্কা
এই বিক্ষোভ ২০২২-২৩ সালের আন্দোলনের পর সবচেয়ে বড়, যা শুরু হয়েছিল পুলিশি হেফাজতে থাকা মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর। তিনি নারীদের কঠোর পোশাকবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে আটক হয়েছিলেন।
আল জাজিরার তেহরান প্রতিনিধি তোহিদ আসাদি জানান, বিক্ষোভগুলো বিচ্ছিন্নভাবে হলেও সাম্প্রতিক দিনে বিশেষ করে রাজধানীতে জোরালো হয়েছে।
তিনি বলেন, “শুরুতে সরকার শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার স্বীকার করেছিল। কিন্তু পরিস্থিতি জটিল হওয়ার পর তারা প্রতিবাদকারী ও তথাকথিত ‘নাশকতাকারীদের’ মধ্যে পার্থক্য টানতে চাইছে।”
আসাদি আরও বলেন, “জনঅসন্তোষ রয়েছে—মানুষ রাস্তায় নামুক বা না নামুক। এখন সবাই দেখছে সরকার শুধু বিক্ষোভ নয়, দৈনন্দিন জীবনের অর্থনৈতিক সংকট কীভাবে মোকাবিলা করে।”
সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিরাপত্তা জোরদার করার পাশাপাশি স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য মাসে প্রায় ৭ ডলার ভর্তুকি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
তবে জর্জটাউন ইউনিভার্সিটি কাতারের অধ্যাপক মেহরান কামরাভা বলেন, “সরকারি হিসাবে মূল্যস্ফীতি ৪২ শতাংশ। বেসরকারিভাবে তা প্রায় ৬০ শতাংশ। এই ভর্তুকি মানুষের চাপ কমাতে পারবে না।”
আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রকল্পের পরিচালক আলি ভায়েজ বলেন, “বর্তমান আন্দোলন দমন করা গেলেও মূল সমস্যাগুলো সমাধান না হলে এটি কেবল সময় কেনা হবে। রাষ্ট্র ও সমাজের মধ্যে পরবর্তী সংঘাত অনিবার্য।”






