দেউলিয়াত্ব ঠেকাতে পাকিস্তান সরকার বেকায়দা অবস্থায় পড়েছে। তীব্র অর্থসংকটে থাকা দেশটি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর শর্ত পূরণ করতে এবং দেউলিয়া হওয়া থেকে বাঁচতে একের পর এক বড় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বিক্রির সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। এর আগে দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে থাকা জাতীয় বিমান সংস্থা পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্স (পিআইএ) বেসরকারিকরণের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। সরকারি নথি ও মন্ত্রিসভার আলোচনায় জানা গেছে, বিদ্যুৎ বিতরণ, ব্যাংকিং, হোটেল, বীমা ও জ্বালানি খাতের একাধিক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ বেসরকারি খাতে হস্তান্তর করা হতে পারে।
সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, অর্থনীতি স্থিতিশীল করতে এই কর্মসূচি এখন “করতেই হবে, না হলে বাঁচার উপায় নেই” — এমন অবস্থায় পৌঁছেছে।
তবে সমালোচকদের মতে, বছরের পর বছর ধরে চলা দুর্বল ব্যবস্থাপনার দায় ঢাকতে সরকার কৌশলগত দেশের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ বিক্রি করছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সংকট আরও তীব্র হয়েছে। দেশের বৈদেশিক ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে।
বিশ্লেষকদের মতে, সরকার এখন দৈনন্দিন খরচ চালানোর জন্যও ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছে। আইএমএফ স্পষ্ট করে জানিয়েছে, ভবিষ্যতে কোনো আর্থিক সহায়তা পেতে হলে বড় পরিসরে বেসরকারিকরণ করতেই হবে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, প্রয়োজনীয় সংস্কার ও রাষ্ট্রায়ত্ত সম্পদ বিক্রি না হলে পাকিস্তান শ্রীলঙ্কার মতো ভয়াবহ ঋণ সংকটে পড়তে পারে।
সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, আগামী ১২ মাসে বেসরকারিকরণের জন্য পাঁচটি বড় খাত বা প্রতিষ্ঠানের তালিকা করা হয়েছে। পাকিস্তানে অনেকে একে অনানুষ্ঠানিকভাবে “এজেন্ডা–৫” পরিকল্পনা বলে ডাকছেন।
১. বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি (ডিসকো)
রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলো দীর্ঘদিন ধরে লাইনে বিদ্যুৎ ক্ষতি ও বিদ্যুৎ চুরির সমস্যায় ভুগছে। ইসলামাবাদের আইইএসসিও, ফয়সালাবাদের ফেসকো এবং গুজরানওয়ালার জেপকো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করা হতে পারে।
২. ব্যাংকিং খাত (ফার্স্ট উইমেন ব্যাংক ও জেটিবিএল)
ফার্স্ট উইমেন ব্যাংক লিমিটেড এবং জারাই তারাকিয়াতি ব্যাংক লিমিটেড বিক্রির তালিকায় রয়েছে। কর্মকর্তাদের দাবি, ব্যাংকিং খাত বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় বেশি দক্ষভাবে পরিচালিত হতে পারে।
৩. হোটেল ও রিয়েল এস্টেট সম্পদ
সরকার নিউইয়র্কের ঐতিহাসিক রুজভেল্ট হোটেল এবং লাহোরের সার্ভিসেস ইন্টারন্যাশনাল হোটেল বেসরকারিকরণের পরিকল্পনা করছে। আশা করা হচ্ছে, এসব বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াতে সহায়তা করবে।
৪. বিদ্যুৎ উৎপাদন কোম্পানি (জেনকো)
লোকসান গুনতে থাকা সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো—যেমন জামশোরো ও লাখড়া এলাকার কেন্দ্র—বিক্রির কথা ভাবা হচ্ছে। এতে সরকারের আর্থিক চাপ কমবে বলে মনে করা হচ্ছে।
৫. বীমা ও খুচরা বিক্রয় নেটওয়ার্ক
স্টেট লাইফ ইন্স্যুরেন্স কর্পোরেশন এবং সারা দেশে থাকা ইউটিলিটি স্টোরগুলোর নেটওয়ার্কও বেসরকারিকরণের তালিকায় যুক্ত হয়েছে। সরকার সরাসরি বাণিজ্যিক কার্যক্রম থেকে সরে আসতে চায়।
পাকিস্তানের হাইব্রিড রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির এবং প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের তত্ত্বাবধানে এই বেসরকারিকরণ কর্মসূচি চলছে। এ নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে।
সমর্থকদের মতে, অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর এটাই একমাত্র বাস্তবসম্মত পথ। অন্যদিকে সমালোচকদের দাবি, রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিক্রি করা শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতার প্রমাণ এবং এতে দেশের আত্মনির্ভরতা দুর্বল হতে পারে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী এসব লেনদেন সম্পন্ন হলে স্বল্পমেয়াদে পাকিস্তান আর্থিকভাবে কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে দেশের সার্বভৌমত্ব, সেবার মান এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতার ওপর এর প্রভাব কী হবে—তা নিয়ে দেশজুড়ে এখনো তীব্র আলোচনা চলছে।