রাঙ্গামাটির কাপ্তাই হ্রদে ফুল ভাসিয়ে শুরু হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ১৪টি ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর বর্ষবরণ ও পাহাড়ীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব বিজু, বৈসু, সাংগ্রাই, বিহু, চাংক্রান, বিষু, সাংলান, চাংক্রাই, পাতা উৎসব। সকাল থেকে পাহাড়ী নারীরা বাগান থেকে ফুল সংগ্রহ করে একে একে চলে আসে কাপ্তাই হ্রদে। সৃষ্টিকর্তার আর্শিবাদ প্রার্থনা করে কাপ্তাই হ্রদে গঙ্গা দেবীর উদ্দেশ্যে পানিতে ফুল ভাসিয়ে দেয় তারা। এসময় ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সজ্জিত হয়ে এই ফুল ভাসানোর উৎসবে অংশ নেন পাহাড়ি মানুষ।
পুরাতন বর্ষ বিদায় ও নতুন বর্ষ বরণকে কেন্দ্র করে পাহাড়ী জনগোষ্ঠী বিভিন্ন এলাকার লোকজন সকালে গঙ্গা দেবীর উদ্দেশ্যে ফুল ভাসানোর মধ্যে দিয়ে উৎসবের সূচনা করা হয়। এটি পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ১৪টি ক্ষুদ্র নৃ -জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে বড় ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব। এটি পাহাড়ে বৈসাবী উৎসব নামে উদযাপন করা হলেও বর্তমানে এই উৎসব পাহাড়ে বসবাসরত সকল সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী উৎসবের নামেই উদযাপন করা হচ্ছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত পাহাড়ীদের সবচেয়ে বড় এই সামাজিক উৎসবকে ঘিরে পাহাড়ে এখন খুশির আমেজ। তিন দিনের বিজু উৎসবকে ঘিরে আনন্দে মেতেছে চাকমা, ত্রিপুরা, মারমা সহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর মানুষ। আগামী ১৩ এপ্রিল মুল বিজু পালিত হবে। ঐতিহ্যবাহী পাঁজন রান্না করে অতিথি আপ্পায়নের মধ্যদিয়ে শুরু হবে মুল বিজুর আনুষ্ঠানিকতা। আগামী ১৪ এপ্রিল পালিত হবে গোজ্যেপোজ্যে। এই উৎসবে পিছিয়ে নেই বাঙ্গালীসহ অন্যান্য ভাষাভাষির মানুষও। বিজু উৎসবকে ঘিরে জেলা শহরের প্রত্যন্ত এলাকায় চলছে পাহাড়ীদের ঐতিহ্যবাহী খেলাসহ নানা আয়োজন। বিজু উপলক্ষে রোববার (১২ এপ্রিল) কাপ্তাই হ্রদে ফুল ভাসাতে আসা চাকমা তরুনী রিপা চাকমা বলেন, পুরাতন বছরকে বিদায় ও নতুন বছরকে বরণ করাসহ দেশ-জাতিসহ সকলের কল্যাণে আমরা ভোরে বিজু উপলক্ষে গঙ্গা দেবীর উদ্দেশ্যে ফুল ভাসিয়েছি। বিজুর প্রথম দিন চাকমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা জনগোষ্ঠীর ফুল বিজু বৈসু কিংবা বিষু হিসেবে পালন করে । এদিন আমরা বন থেকে ফুল আর নিম পাতা সংগ্রহ করে ফুল দিয়ে ঘর সাজানোর পাশাপাশি গঙ্গাদেবীর উদ্দেশ্যে কাপ্তাই হ্রদে ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে উৎসবের সূচনা করি। ১২ এপ্রিল থেকে বিজু উৎসবের প্র্রথম দিন উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হলেও এপ্রিলের শুরুতেই পাহাড়ে শুরু হয়ে যায় বিজু উপলক্ষে নানা উৎসব। বিজুর শুরুতেই কাপ্তাই হ্রদে গঙ্গাদেবীর উদ্দেশ্যে ফুল ভাসিয়ে অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করেন ক্ষুদ্র-নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর মানুষেরা। বৈসাবী উৎসব পার্বত্য এলাকার ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় উৎসব হলেও পাহাড়ে এটা সকল সমাপ্রদায়ের একটি মিলনমেলা বলা চলে। বৈসাবীর মেলায় অংশ নিয়েছে পাহাড়ী-বাঙ্গালীসহ সকল সম্প্রদায়ের মানুষ। বিজু উৎসবে পাহাড়ীদের সাথে পিছিয়ে নেই বাঙ্গালীরাও। পাহাড়ীদের বিজু উৎসবে অংশ নেওয়া তরুনী মনি জানান, বর্ষবরণকে ঘিরে পাহাড়ে বিজু উৎসবে পাহাড়ীদের সাথে আমরা বাঙ্গালীরাও আনন্দে মেতে উঠি। বর্ষবরণের উৎসব পাহাড়ে অনেক ভিন্নতা রয়েছে, এখানে পাহাড়ীদের বিজু উৎসব ও বাঙ্গালীদের বর্ষবরণের উৎসবে রঙিন হয়ে উঠে রুপের রাণী রাঙ্গামাটি।
রাঙ্গামাটি বিজু উৎসব উদযাপন কমিটির সদস্য সচিব ইন্টু মনি তালুকদার জানান, চৈত্র সংক্রান্তিতে পুরাতন বছরকে বিদায় ও নতুন বছরকে বরণ করতে পাহাড়ে এখন বিজু উৎসবের আমেজ বইছে। তিনি বলেন, বিজু উৎসব উপলক্ষে সকালে রাজবাড়ী ঘাটে কাপ্তাই হ্রদে গঙ্গাদেবীর উদ্দেশ্যে ফুল ভাসিয়ে উৎসবের সুচনা করেছি। পুরাতন বছরের গ্লানি ভুলে ভবিষ্যতে সুন্দর জীবনের প্রত্যাশায় আমরা সকলে প্রার্থনা করেছি। আগামী বছরগুলোতে যেন বিশ্বের সকল মানুষ ভালো থাকে এবং পাহাড়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সেতুবন্ধন সুদৃঢ় থাকে এটাই সকলের প্রত্যাশা। পাহাড়ে বসবাসরত ক্ষুদ্র-নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর এই উৎসব তিনটি আলাদা নামে হলেও সমতলের মানুষের কাছে তা বিজু নামে পরিচিত। জেলা শহরের পাশাপাশি জেলার ১০টি উপজেলাতেও বর্ণাঢ্য আয়োজনে বিজু উৎসব পালিত হচ্ছে বলে জানান তিনি।
আগামী ১৪ এপ্রিল থেকে ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত চলবে মারমাদের জল কেলী উৎসব। আর নানা আয়োজনে পাহাড়ে থাকছে বাঙ্গালীদের বর্ষবরণের নানা আয়োজন। আগামী ১৭ এপ্রিল রাঙ্গামাটির চিং হ্লা মং মারী স্টেডিয়ামে মারমাদের বৃহত্তম জলকেলি উৎসবের মধ্য দিয়েই রাঙ্গামাটিতে সমাপ্তি হবে পাহাড়ের বিজু উৎসব। তবে মাস ব্যাপী এই উৎসব রাঙ্গামাটির বিভিন্ন গ্রামে গ্রামে অনুষ্ঠিত হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর বিজু উৎসব এবং বাঙ্গালীদের বর্ষবরণের নানা আয়োজনে সম্প্রীতির রঙে রঙিন ও বর্ণিল হয়ে উঠবে পাহাড় এমনটাই প্রত্যাশা সকলের।