1. admin@shwapnoprotidin.com : admin : ddn newsbd
রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬, ০১:০০ অপরাহ্ন
শিরোনাম :

লোকসানের মুখে বিক্রেতারা, জ্বালানি সাশ্রয়ে সন্ধ্যায় দোকান বন্ধ

প্রতিবেদকের নাম :
  • আপডেটের সময় : রবিবার, ১২ এপ্রিল, ২০২৬
  • ১৮ সময় দর্শন
স্বপ্ন প্রতিদিন রিপোর্ট

দেশজুড়ে জ্বালানি সাশ্রয়ে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে বিপণিবিতানসহ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধের ঘোষণায় খুচরা বাণিজ্যে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। পরিচালন ব্যয় না কমলেও লেনদেন সময় কমপক্ষে দুই-তিন ঘণ্টা কমে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন দেশের ছোট ও মাঝারি পর্যায়ের বিক্রেতারা। ব্যবসায়ীদের মতে, বিক্রি আগের তুলনায় কমে যাওয়ায় খরচ ওঠানোই কঠিন হয়ে পড়ছে। এ অবস্থায় লেনদেন সময় কমপক্ষে এক ঘণ্টা বাড়িয়ে রাত ৮টা পর্যন্ত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

রাজধানীর বিপণিবিতানে সাধারণত বিকেলের পর থেকে রাত পর্যন্ত ক্রেতাদের উপস্থিতি বেশি থাকে। কর্মজীবী মানুষ অফিস শেষে কেনাকাটার জন্য বের হন—এটাই দীর্ঘদিনের চর্চা। ব্যবসায়ীরা জানান, নতুন সময়সীমা কার্যকর হওয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। সন্ধ্যার আগেই দোকান গুটিয়ে নিতে বাধ্য হওয়ায় বিক্রির প্রধান সময় কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে চাকরিজীবী যারা অফিস শেষ করে কেনাকাটা করতে বের হতেন, তারা এখন সময় কম পাচ্ছেন। এর ফলে প্রতিদিনের গড় বিক্রয়লব্ধ অর্থের পরিমাণ প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।

রাজধানীর নিউ মার্কেট, বসুন্ধরা সিটি ও গুলিস্তানের বাণিজ্যিক এলাকার দোকানিরা জানান, প্রতিদিন গড়ে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বিক্রি কমে গেছে। আগের মতো রাত পর্যন্ত ব্যবসা চালানো সম্ভব না হওয়ায় দিনশেষে হিসাব মিলছে না। বিশেষ করে পোশাক, ইলেকট্রনিক্স ও প্রসাধনী পণ্যের দোকানগুলো বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে।

ঢাকা নিউ মার্কেটের পোশাক বিক্রেতা মো. আল-আমিন বলেন, এখানে ছেলেদের পোশাক বিক্রি করা হয়। আমাদের ক্রেতার একটা বড় অংশ কর্মজীবী হওয়ায় বেশির ভাগ বিক্রি হতো সন্ধ্যার পর। যারা অফিস শেষ করে মার্কেটে আসতেন, এখন আগেভাগেই শাটার নামাতে হচ্ছে বলে তাদের উপস্থিতি কমে গেছে। এতে প্রতিদিনের আয়ের বড় অংশ হারাচ্ছি, কিন্তু ভাড়া কিংবা কর্মচারীর বেতন ঠিকই দিতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি নাজমুল হাসান মাহমুদ বলেন, এই বিধিনিষেধের ফলে খুচরা বিক্রয় খাতে প্রতিদিন শত শত কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। খুচরা ব্যবসায়ীদের মূলধন সীমিত এবং প্রতিদিনের বিক্রির ওপরই তারা নির্ভরশীল। মূলত সন্ধ্যা-পরবর্তী তিন থেকে চার ঘণ্টায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ বিক্রি হয়। বর্তমানে কর্মচারীদের বেতন, দোকান ভাড়া এবং বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করা অনেক মালিকের পক্ষেই দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তিনি বলেন, জ্বালানি সাশ্রয় জরুরি হলেও অর্থনীতির চাকা সচল রাখা তার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কেননা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপিতে খুচরা ও পাইকারি ব্যবসার অবদান ১৫ শতাংশ। অন্যদিকে, দেশের মোট বিদ্যুতের মাত্র তিন শতাংশ দোকান ব্যবসায়ীরা ব্যবহার করে। আমরা সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় কিছুটা নমনীয়তা দরকার। অন্যথায় তৃণমূলের ব্যবসায়ীরা দেউলিয়া হয়ে যাবে।

তিনি আরো বলেন, পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে আরো গভীর হবে। ৭০ লাখ ক্ষুদ্র ও মাঝারি দোকান ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হলে, এর সঙ্গে জড়িত আড়াই কোটি মালিক-শ্রমিকের জীবন ও জীবিকা অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে। এ অবস্থায় অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে ও মালিক-শ্রমিকের কল্যাণে ঢাকাসহ সারা দেশে শপিংমল, বিপণিবিতান ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান দুপুর ১২টা থেকে রাত ৮টা বা ৯টা পর্যন্ত খোলা রাখার বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন করছি।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, সন্ধ্যার পরেই ব্যস্ত বিপণিবিতানগুলো ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। আগে যেখানে রাত ১০টা বা ১১টা পর্যন্ত বেচাকেনা চলত, সেখানে এখন মাগরিবের পরপরই দোকান বন্ধের প্রস্তুতি শুরু হয়। ফলে ক্রেতা উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। মার্কেটে আগত কয়েকজন চাকরিজীবী জানিয়েছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কেনাকাটা করা সম্ভব হচ্ছে না।শুধু খুচরা খাত নয়, পাইকারি বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। ঢাকার গাউছিয়া মার্কেটে মেয়েদের পোশাকের পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, খুচরা পর্যায়ে বিক্রি কমে যাওয়ায় তাদের কাছ থেকে পণ্য উত্তোলনও কমেছে। বড় অর্ডার না আসায় গুদামে পণ্য জমে থাকছে। এতে সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে এবং পুরো বাণিজ্য চক্রে স্থবিরতা দেখা দিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাস্তবে সাশ্রয় নির্ভর করে মানুষের আচরণগত পরিবর্তনের ওপর। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে সান্ধ্যকালীন কেনাকাটা একটি সামাজিক অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। দিনের গরম এড়িয়ে মানুষ সাধারণত বিকালের পর বাজারে যায়। সময়সীমার কড়াকড়িতে সেই ধারা ভেঙে পড়েছে। ফলে অভ্যন্তরীণ ভোগ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।তারা বলছেন, অনেক ক্রেতা এখন অনলাইন কেনাকাটার দিকে ঝুঁকছেন। এতে ই-কমার্স খাতে কিছুটা ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেলেও প্রচলিত বাজার ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদে খুচরা বাণিজ্যের কাঠামোয় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

সরকারি সূত্র জানিয়েছে, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং এলএনজির উচ্চমূল্যের কারণে বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা ছাড়া বিকল্প পথ সীমিত। তবে পরিস্থিতি উন্নত হলে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার সুযোগ রয়েছে।

অর্থনীতিবিদরা জানান, স্বল্পমেয়াদে এই পদক্ষেপ কার্যকর হলেও দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব বিবেচনা করা প্রয়োজন। বাণিজ্যিক কার্যক্রম ব্যাহত হলে রাজস্ব আয় কমে যেতে পারে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তারা বিদ্যুৎ ব্যবহারে দক্ষতা বাড়ানো, বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার এবং পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিচ্ছেন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার হলেও দেশের সচল অর্থনীতিকে স্তব্ধ করে তা করা সমীচীন নয়। ব্যবসায়ীদের স্বার্থরক্ষা এবং জাতীয় অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সরকার ও বেসরকারি খাতের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় জরুরি। অন্যথায়, স্থবির হয়ে পড়া এই বাণিজ্যিক ক্ষত নিরাময়ে দেশকে বহু বছর অপেক্ষা করতে হতে পারে। দেশের সাধারণ মানুষ এবং ব্যবসায়ী সম্প্রদায় এখন অপেক্ষা করছেন এক যৌক্তিক সমাধানের, যা একই সঙ্গে বিদ্যুৎ বাঁচাবে এবং মানুষের রুটি-রুজির সংস্থানও নিশ্চিত রাখবে।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর
২০২5© এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ*
ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: Smart iT Host