ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, যদি প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স কমে যায়, তাহলে দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধস নামার আশঙ্কা রয়েছে। ইরান যুদ্ধে জ্বালানি সংকট সেই সাথে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স কমলে, বর্তমান রিজার্ভ দিয়ে মাত্র ৪ মাস চলতে পারবে বাংলাদেশ।
মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চলমান যুদ্ধের কারণে রেমিট্যান্সে প্রভাব পড়ার কথা বলেছেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান বিষয়ক মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, “এটা তো স্বাভাবিক, কিছু প্রভাব তো পড়বেই। কারণ, যুদ্ধের জন্য বাংলাদেশি শ্রমিকরা কাজে যেতে পারছেন না। তাদের মধ্যে নানা ভয়-ভীতি কাজ করছে। রেমিট্যান্সে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের জন্য সরকার নানা উদ্যোগ নিয়েছে। দ্রুতই তা দৃশ্যমান হবে।”
রোববার দুপুরে সিলেট জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও এলএনজির দাম বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশকে অতিরিক্ত ব্যয়ে জ্বালানি আমদানি করতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স যদি কমে যায়, তাহলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দ্রুত কমে যাবে এবং অর্থনীতিতে গভীর সংকট দেখা দিতে পারে বলে অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
প্রবাসীদের রেমিট্যান্স প্রবাহে সাম্প্রতিক উত্থান লক্ষ্যণীয়। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সরকারি চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানো কমে যাওয়ায় ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে মাসিক রেমিট্যান্স ৮০০-৯০০ মিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছিল। কিন্তু আগস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে রেমিট্যান্সে বড় উত্থান ঘটে।
- ২০২৪-এর আগস্ট-ডিসেম্বর (~৫ মাস): ~১২-১৩ বিলিয়ন
- ২০২৫ পুরো বছর: ~৩২.৮ বিলিয়ন (রেকর্ড)
- ২০২৬-এর জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি: ~৬.২ বিলিয়ন
বিগত ১৮ মাসে (আগস্ট ২০২৪ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত) রেমিট্যান্স এসেছে ৫০-৫২ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালে রেকর্ড ৩২.৮ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা ২০২৪-এর তুলনায় ২২% বেশি। এই বিশাল প্রবাহ রিজার্ভ বাড়াতে সাহায্য করলেও, অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে রিজার্ভ মাত্র ৮-৯ বিলিয়ন ডলার বেড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে—যা অযাচিত খরচ বা জ্বালানী এলএনজি ক্রয়ে অনিয়মের কারনে সৃষ্ট হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
বর্তমানে বাংলাদেশের গড় মাসিক আমদানি ব্যয় প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার। সাম্প্রতিক তথ্য অনুসারে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ (IMF BPM6 পদ্ধতিতে) প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলারের আশেপাশে রয়েছে (গ্রস রিজার্ভ ৩৫ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি)। যদি রেমিট্যান্স কমে যায় এবং জ্বালানি আমদানির খরচ বাড়ে, তাহলে রিজার্ভ দিয়ে ঝুঁকিমুক্তভাবে মাত্র ৫-৬ মাস চলতে পারবে দেশ।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে, যা মাসিক আমদানি বিলে অতিরিক্ত ৮০-১০০ মিলিয়ন ডলার যোগ করবে এর ফলে বর্তমান রিজার্ভ ৪ মাসের ব্যয় মেটাতে সক্ষম। এই পরিস্থিতিতে সরকারকে জ্বালানি আমদানি নিয়ন্ত্রণ, অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানো এবং রেমিট্যান্স চ্যানেল আরও শক্তিশালী করার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। অন্যথায়, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়তে পারে।






