পেকুয়া উপজেলার জালিয়ারচাংয়ের একটি পাহাড়ের নাম ‘আসমানের খুঁটি’। সেই পাহাড়টি কেটে সাবাড় করা হয়েছে। এমনভাবে পাহাড় কাটা হয়েছে যে, পাশের বাড়িগুলো দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে পড়েছে। টৈটং বনবিট কর্মকর্তা মো. এহেসান টাকার বিনিময়ে পাহাড় ও গাছ কাটার অনুমতি দেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অবৈধ বালু উত্তোলন, বনের ভেতরে বসতি স্থাপন, মামলা বাণিজ্যসহ আরও অনেক অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। সহযোগী অলি আহমদের মাধ্যমে মাসোহারা আদায় করেন তিনি। স্থানীয়দের অভিযোগ, ১৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা দিলে সংরক্ষিত বনে নলকূপ বসানোর অনুমতি দেন বিট কর্মকর্তা এহেসান। ঘর তৈরির জন্য তাঁকে দিতে হয় ৫০ হাজার থেকে দুই লাখ টাকা। স্থানীয় এক নারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘রিজার্ভের জায়গায় বসত করায় প্রতিমাসে ১০০ টাকা করে চাঁদা দিতে হয় বিট কর্মকর্তা এহেসানকে। গত ডিসেম্বরে বাড়ি মেরামত করতে অতিরিক্ত চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা না দেওয়ায় আমার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন।’
সরেজমিনে দেখা যায়, টৈটং ইউনিয়নের বনকানন এলাকায় বন বিভাগের জায়গায় তিন তলা স্থায়ী পাকা দালান নির্মাণ করছেন প্রবাসী মোস্তাক আহমদ। এ জন্য বিট কর্মকর্তা মো. এহেসানের হাতে দুই লাখ টাকা দিতে হয়েছে। চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের বারবাকিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা খালেকুজ্জামান বলেন, ‘অভিযোগের বিষয়গুলো আমি খতিয়ে দেখছি। সত্যতা পাওয়া গেলে অবশ্যই বিট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ স্থানীয় লোকজন বলেন, টৈটং ইউনিয়নের জালিয়ারচাং গর্জনিয়া পাড়ায় দুই সপ্তাহ ধরে চলছে পাহাড় কাটা। রাত হলেই ডাম্প ট্রাক ও এক্সক্যাভেটরের তীব্র শব্দ স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। স্থানীয় প্রভাবশালী আবু তাহের, মো. বাচ্চু, মো. শাহাদাত ও মো. ইসমাইল বিট কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে পাহাড় কাটছেন। টৈটং বাজারসহ বিভিন্ন স্থানে পাহাড় কাটায় জড়িতদের সঙ্গে খোশগল্প করতে দেখা যায় বিট কর্মকর্তাকে। এমন কয়েকটি ছবি সামাজিক মাধ্যমে ভেসে বেড়াচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, প্রায় এক একর আয়তনের পাহাড়টির বেশির ভাগ অংশ কেটে ফেলা হয়েছে। এক বছর আগে থেকে ধীরে ধীরে কাটা হয়েছে। দুই সপ্তাহ আগে নতুন করে এক্সক্যাভেটর দিয়ে কাটা হচ্ছে। পাহাড় কর্তনের ফলে আবদুল খালেক, আবদুল মালেক ও মোহাম্মদ শোয়াইবের বাড়ি ঝুঁকিতে পড়েছে। যে কোনো সময় ভূমিধসে ঘরবাড়ি মাটির নিচে চাপা পড়তে পারে–এই আশঙ্কায় রয়েছেন তারা।
মোহাম্মদ শোয়াইব বলেন, ‘‘জালিয়ারচাংয়ের এই পাহাড়টি বহু বছরের পুরোনো। স্থানীয়ভাবে একে ‘আসমানের খুঁটি’ বলা হয়। এই পাহাড়টি কেটে ফেলায় আমরা এখন ভয়াবহ ঝুঁকিতে।’’ আবদুল খালেক বলেন, ‘পাহাড়টি এমনভাবে কাটা হয়েছে যে যেকোনো মুহূর্তে আমাদের ঘর ধসে পড়তে পারে। নিরাপদ দূরত্ব রেখে পাহাড় কাটার অনুরোধ জানালে উল্টো অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করা হয়েছে আমাদের।’
স্থানীয় বাসিন্দা মো. জয়নাল কর্মসূত্রে মহেশখালী থাকেন। সেখানে লবণ মাঠের শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। তিনি বলেন, ‘মায়ের অসুস্থতার কথা শুনে মহেশখালী থেকে বাড়ি ফেরার পথে বিট কর্মকর্তা এহেসান ও তাঁর সহযোগী অলি আহমদ আমাকে আটক করে বারবাকিয়া রেঞ্জ অফিসে নিয়ে যায়। হাতে থাকা বন্দুক দিয়ে আঘাত করে মোবাইল ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেয়। এক রাত আটক করে রেখে মামলার ভয় দেখিয়ে ২০ হাজার টাকা আদায় করে পরদিন দুপুর ২টার দিকে ছেড়ে দেয়।’ স্থানীয় লোকজন জানান, বিট কর্মকর্তার প্রশ্রয়ে অলি আহমদ পাহাড়ি ছড়া থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করেন। অথচ বিট কর্মকর্তা নিরপরাধ মানুষকে বালু উত্তোলনের দায়ে আটক করে নিয়ে যায়। মামলার ভয় দেখিয়ে চাঁদা আদায় করে। টৈটং ইউনিয়নের ৭ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা মিজান উদ্দিন বলেন, ‘বালু উত্তোলনের অপবাদ দিয়ে আমার মানসিক প্রতিবন্ধী ভাইকে মধ্যরাতে তুলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে বিট কর্মকর্তা এহেসান ও তাঁর সহযোগী অলি আহমদ। তবে স্থানীয় লোকজন ঐক্যবদ্ধ হয়ে ধাওয়া দিলে তাঁরা পালিয়ে যান।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে অলি আহমদের মোবাইলে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি। টৈটং বনবিট কর্মকর্তা মো. এহেসান অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত অনিয়মের কারণে আমি অনেকজনকে মামলা দিয়েছি। যাঁরা এরকম হামলার আসামি হয়েছেন, তাঁরাই শত্রুতা বশত এসব অপপ্রচার চালাচ্ছেন।’
পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহবুবুল আলম মাহাবুব বলেন, ‘এরকম সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে অবশ্যই বিট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ খতিয়ে দেখা হবে।’