“আপনার পথচলা নিয়ে কিছু শোনান…”, এটুকু বলে সঞ্চালক হার্শা ভোগলে যোগ করলেন, “আপনি ঝুনঝুনু থেকে এসেছেন, সিকার থেকে এসেছেন, আরাভালি একাডেমিতে ছিলেন… ওখান থেকে তো খুব বেশি ক্রিকেটার আসে না… আপনার সফরের গল্প শোনান…।” হার্শার কথায় বোঝা গেল, মুকুল চৌধুরির গল্পের কিছুটা তিনি জানেন। কিন্তু তরুণ এই ক্রিকেটার বাকি যা কিছু শোনালেন, তা আরও চমকপ্রদ।
এই আলোচনার একটু আগে মুকুল যা করেছেন, তাকে নিয়ে আগ্রহ থাকার কথা শুধু হার্শার নয়, গোটা ভারতের, এমনকি বিশ্ব ক্রিকেটের অনেকেরও। আইপিএলে নিজের স্রেফ তৃতীয় ম্যাচেই অবিশ্বাস্য এক ইনিংস খেলে লাক্ষ্ণৌ সুপার জায়ান্টসকে জিতিয়েছেন তিনি। কলকাতা নাইট রাইডার্সের বিপক্ষে বৃহস্পতিবার ইডেন গার্ডেন্সে যখন ক্রিজে গেলেন মুকুল, জয়ের জন্য লাক্ষ্নৌর প্রয়োজন ছিল ৪৩ বলে ৭৮ রান। উইকেট ছিল ৫টি। ৩৪ বলে ৫৪ রান করা আয়ুশ বাদোনি বিদায় নিলেন একটু পর, টিকতে পারলেন না মোহাম্মদ শামিও। ব্যাটসম্যান বলতে ছিলেন কেবল মুকুলই। তিনিও ধুঁকছিলেন। ৮ বলে তার রান ছিল ২ রান। লাক্ষ্নৌর জয়ের জন্য তখন প্রয়োজন ২২ বলে ৫৪ রান। উইকেট ৩টি। কলকাতার জয় মনে হচ্ছিল স্রেফ সময়ের ব্যাপার। এরপর যা হলো, ক্রিকেট বিশ্ব তাতে চিনে নিল একজন মুকুলকে। বৈভাব আরোরাকে চার ও ছক্কা মেরে শুরু। কার্তিক তিয়াগির ওভারে মারলেন দুটি ছক্কা, ক্যামেরন গ্রিনকে ছক্কা, চার, ছক্কা। শেষ ওভারে বৈভাবকে আরও দুটি ছক্কা এবং শেষ বলে ‘বাই’ রান নিয়ে ৩ উইকেটের অবিশ্বাস্য জয়! সাতে নেমে সাত ছক্কায় ২৭ বলে ৫৪ রানের ইনিংস খেলে মুকুল শুধু ম্যাচের নায়কই নন, আইপিএলের নতুন সেনসেশন তিনি।
২১ বছর বয়সী কিপার-ব্যাটার ম্যাচের পর বললেন, ক্রিকেটার হওয়াটা তার ভাগ্যেই লেখা ছিল, ছিল তার বাবার স্বপ্ন। “আমার যাত্রা শুরু আসলে আমার জন্মেরও আগে থেকে! বাবার যখন বিয়েও হয়নি, তখনই তিনি ভেবে রেখেছিলেন, বিয়ের পর ছেলে হলে ক্রিকেটার বানাবেন। তার স্বপ্ন ছিল এটি। ওই সময় পরিবারের অবস্থা খুব ভালো ছিল না যে, ছেলেবেলায় দ্রুতই ক্রিকেট শুরু করতে পারব। ১২-১৩ বছর বয়সে শুরু করেছি।”
তার জন্ম রাজস্থানের ছোট্ট শহর ঝুনঝুনুতে। ক্রিকেট শেখার তাড়নায় পরে যোগ দিয়েছেন ৭০ কিলোমিটার দূরের শহর সিকারে। সেখান থেকে নানা পথ ধরে এগিয়ে গেছেন তিনি ক্রিকেটের তাড়নায়।
“ওখানে (ঝুনঝুনু) এত একাডেমি বা এসব ছিল না। সিকারে ওই সময় একটি একাডেমি খোলা হয়েছিল, এসবিএস একাডেমি। ওখানে ৫-৬ বছর তৈরি হয়েছি। এরপর জয়পুরে (রাজস্থানের রাজধানী) এসেছি, কারণ বড় পর্যায়ে ক্রিকেট খেলতে হলে সামনে এগিয়ে যেতেই হবে। গত চার বছর ধরে জয়পুরে খেলছি।”
“গত বছর আমার মনে হয়েছে, টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট খুব গতিময় হয়ে গেছে। আমাকে অনেক ম্যাচ খেলতে হবে। এজন্য আমি গুরগাওয়ে ছিলাম তিন-চার মাস, দিল্লিতে ম্যাচ খেলেছি।। ওসব আমার অনেক কাজে লেগেছে। এই ছিল আমার পথচলা।”
সেই বাবা প্রথম কবে বিশ্বাস পেলেন যে, তার ছেলে সত্যিই বড় ক্রিকেটার হবে, সেই গল্পও শোনালেন মুকুল।
“বাবা আমাকে বলেছেন যে, অনূর্ধ্ব-১৯ পর্যায়ে একটি ম্যাচ ছিল আমাদের, উত্তর প্রদেশের বিপক্ষে। লো-স্কোরিং ম্যাচ ছিল, অন্য কেউ ভালো করতে না পারলেও আমি রান করেছিলাম। ওই ইনিংসটি, উনি আমাকে বলেছেন যে, ওই দিনই তার বিশ্বাস জন্মে গিয়েছিল যে, কিছু করতে পারব আমি।”
রাজস্থানের হয়ে তার রাঞ্জি ট্রফিতে অভিষেক ২০২৩ সালে। ওই বছরের শেষ দিকে পা রাখেন টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে। লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে অভিষেক গত বছর। এখনও পর্যন্ত প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে খেলেছেন ৪ ম্যাচ, লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে ৫টি। কোনো ফিফটি করতে পারেননি। তবে তার জন্য আইপিএলের দুয়ার খুলে যায় গত সৈয়দ মুশতাক আলি ট্রফির পারফরম্যান্সে।
ভারতের এই টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টের গত আসরে ৫ ইনিংসে ১৭৩ রান করেন তিনি প্রায় ২০০ স্ট্রাইক রেটে। আইপিএল দলগুলির নজর পড়ে তার ওপর। ২ কোটি ৬০ লাখ রুপিতে তাকে দলে নেয় লাক্ষ্নৌ।
আইপিএল অভিষেকে তিনি আউট হন ১১ বলে ১৪ রান করে, পরের ম্যাচে অপরাজিত থাকেন ৫ বলে ২ রান করে। তৃতীয় ম্যাচে দেখালেন, কেন তাকে পেতে এত টাকা খরচ করেছে দল।
কৃত্রিম আলোয় জীবনে মাত্র দ্বিতীয়বার ব্যাট করলেন তিনি। সেটিও জানালেন। পাশাপাশি তুলে ধরলেন চাপকে জয় করার তার দর্শন। “চাপ তো আছেই। তবে সৃষ্টিকর্তা আমাকে সুযোগটা দিয়েছেন, আমার স্রেফ বিশ্বাস থাকে, আমার হাতে যেটুকু আছে, তা করার চেষ্টা করি। কারণ, এটি একটি সুযোগও, বড় কিছু করার সুযোগ। চাপ যেমন আছে, তেমনি নিজের নাম বানানোর সুযোগও আছে। চাপের জায়গায় আমি সেটিই দেখি।”
এই ম্যাচের একটা পর্যায়ে লাক্ষ্নৌর জয় ছিল অনেকেরই ধারণার বাইরে। তবে মুকুলের বিশ্বাস ছিল, তিনি পারবেন।
“আমার ভাবনায় ছিল, শেষ পর্যন্ত খেলব। যদি শেষ পর্যন্ত খেলতে পারি, তাহলে জিতিয়ে দেব, এই বিশ্বাস নিজের ওপর ছিল। ভেবেছি শুধু শট খেলে যাব, নিজের জায়গায় বল পেলে মারব। বাকিটা দেখা যাবে…।”
মাহেন্দ্র সিং ধোনিকে আদর্শ মেনে তিনি বেড়ে উঠেছেন। এ কিংবদন্তির মতোই হেলিকপ্টার শটে একটি ছক্কা মেরেছেন। তরুণ ধোনির মতোই তার দর্শনে শুধু আছে আগ্রাসী ব্যাটিং।
“ছেলেবেলা থেকেই, যখন থেকে খেলছি, আমি সবসময়ই মেরেই খেলি। বল নিচে-টিচে রাখার খুব ইচ্ছা আমার কখনোই থাকে না। নিজের জায়গায় বল পেলে মারবই।”
তার জন্মস্থান ঝুনঝুনু থেকে তরুণদের সেনাবাহিনীতে যাওয়ার প্রবণতাই বেশি। তিনি বেছে নিয়েছেন ভিন্ন পথ। তবে কাজের ধরন একইরকম, বললেন তিনি।
“রক্তে সেটাই আছে… আমি এখানে করছি, তারা সীমান্তে দেশের জন্য করছে..।”