– হাসান মুরশেদ
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের বিরাজনৈতিক বয়ান প্রতিষ্ঠার প্রকল্প পুরনো। এই প্রকল্পে মুক্তিযুদ্ধকে ২৫ মার্চ রাতের পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসাবে দেখানো হয়। অর্থ্যাৎ “হানাদারবাহিনী রাতের অন্ধকারে ঝাঁপাইয়া পড়িলো আর আমরা আত্মরক্ষার্থে যুদ্ধ শুরু করিলাম”। এই ‘আমরা’র মধ্যে একটি গণমানুষের প্রলেপ দেয়া হয়- যারা রাজনীতি বহির্ভুত। আবার সামরিক কর্মকর্তাদের উপর এমনভাবে স্পটলাইট ফেলা হয় যেনো তাঁরা রাজনৈতিক নেতৃত্ব মানা সুশৃংখল দেশপ্রেমিক নয় বরং এক একজন ওয়ারলর্ড- নিজেদের খেয়ালখুশি মতো যুদ্ধ করেছেন। এই ফ্যান্টাসিতে আসলে মহত্ব আরোপের বদলে তাঁদের অপমান করা হয়।
এই বিরাজনীতিকরন প্রকল্পটির উদ্দেশ্য হচ্ছে- মুক্তিযুদ্ধ যে একটি রাজনৈতিক সংগ্রামের চূড়ান্ত পরিনতি, সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক নেতৃত্বে পরিচালিত- সেই সত্যকে গৌন করা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ম্লান করে দেয়া।
২৫ মার্চ রাত ৮.৪৫ মিনিটে চট্টগ্রামে মুক্তিযুদ্ধের নিরবিচ্ছিন্ন সশস্ত্র পর্বের সুচনা করেন ক্যাপ্টেন রফিকুল ইসলাম। ক্যাপ্টেন রফিকের সাক্ষ্যে জানা যায় এর কয়েকদিন আগে থেকে তিনি সহ মেজর জিয়া ও লেঃ কর্ণেল এম আর চৌধুরীর সাথে গোপন বৈঠক করছিলেন চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ। ২৫ মার্চ সন্ধ্যা ৭টার পর ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের নেতৃত্বকে জানানো হয়- আলোচনা ভেঙ্গে গেছে, বাঙালী সৈন্যরা যেনো অস্ত্র না ছাড়ে। সেই বার্তা পেয়েই ক্যাপ্টেন রফিক বিদ্রোহের সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন।
ঠিক একই চিত্র দেখতে পাবেন প্রতিটি জায়গায়। ৭ মার্চের পর বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত গড়ে উঠেছে সংগ্রাম কমিটি- স্থানীয়ভাবে প্রশিক্ষন চলছে। প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু হয়েছে রাজনৈতিক নেতৃত্বে, সুনির্দিষ্টভাবে ‘৭০ এর নির্বাচনে নির্বাচিত এমএনএ ও এমপিএদের নেতৃত্বে। প্রতিটি জায়গায় তাঁরা সমন্বয় করেছেন বাঙালী সেনাকর্মকর্তাদের সাথে। হবিগঞ্জে বেসামরিক নেতৃত্বই মেজর সিআর দত্তকে দায়িত্ব অর্পণ করেছেন- সিলেট মুক্ত করার অভিযান পরিচালনা করতে। বরিশালে মেজর জলিলকে সামরিক কমাণ্ডারের দায়িত্ব দিয়েছেন বেসামরিক নেতৃত্ব। কুষ্টিয়া-চুয়াডাঙ্গায় মেজর আবু ওসমান চৌধুরী যৌথ কমাণ্ড গঠন করেছেন ডাঃ আসহাব-উল- হক ও এডভোকেট ইউনুস আলীর মতো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সাথে। সুনামগঞ্জের মতো প্রান্তিক শহরে কোন বাঙালী সামরিক অফিসার ছিলেন না, সেখানে প্রতিরোধ যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছেন বেসামরিক নেতৃত্ব।
এসবই প্রথাসম্মত এবং বাস্তব। যুদ্ধের সামরিক পরিচালনার জন্য সামরিক নেতৃত্ব অপরিহার্য কিন্তু যুদ্ধে যখন সাধারন মানুষের অংশগ্রহন জরুরী তখন রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিকল্প নেই কারন জনগনের উপর কর্তৃত্ব থাকে রাজনীতিবিদদের, তাঁরাই জনগনের প্রতিনিধি। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধের মতো চরিত্রগত ভাবে প্রতিরোধ যুদ্ধের আইনী বৈধতার জন্য জনগনের নির্বাচিত কর্তৃপক্ষ থাকতে হয়। সে জন্য দেখবেন- ৪ এপ্রিল তেলিয়াপাড়ার সভায় সামরিক অফিসাররা বারবার তাগাদা দিচ্ছেন, দ্রুত সরকার গঠনের জন্য। না হলে তাঁরা স্রেফ বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত হয়ে পড়বেন।
আইনী বৈধতার কথা যখন এলো, ভাবা যেতে পারে- গ্রেপ্তার হওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু কোন অধিকারে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষনা করলেন? কারন তাঁর, একমাত্র তাঁরই এই আইনী বৈধতা ছিলো। তিনি তখন সেই রাজনৈতিক দলের প্রধান যে দলটিকে জনগন প্রাদেশিক ও কেন্দ্রীয় সরকার গঠন ও সংবিধান রচনার অধিকার প্রদান করেছে। জনগন আক্রান্ত হয়েছে বলে, জনগনের পক্ষ থেকে এই ঘোষনা দেয়ার অধিকার একমাত্র তাঁরই ছিলো। এরকম নিরংকুশ ম্যান্ডেট প্রাপ্ত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে পালিয়ে গিয়ে নেতৃত্ব দিতে হয় না বরং তাঁর গ্রেপ্তার হওয়ার কুটনৈতিক ও রাজনৈতিক অভিঘাত অনেক তীব্র। এর ফলে পাকিস্তানী কর্তৃপক্ষ সারা বিশ্বের কাছে বেকায়দায় পড়েছে- অগনতান্ত্রিক ও স্বৈরাচারী বলে চিহ্নিত হয়েছে।
আইনী বৈধতার দ্বিতীয় মাস্টার স্ট্রোক ছিলো- ১০ এপ্রিল ১৯৭১। পাকিস্তানীদের আক্রমনের দু সপ্তাহের মধ্যে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিগন জড়ো হয়ে স্বাধীনতার ঘোষনাপত্র রচনা করে সার্বভৌম সরকার গঠন করলেন। সরকার গঠনের পূর্ণ কর্তৃত্ব তাঁদেরকে দিয়েছিলো ১৯৭০ এর নির্বাচন। তাঁরা স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠন করেছেন, তাঁদের নেতার স্বাধীনতার ঘোষনা রেক্টিফাই করেছেন, প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট মনোনয়ন করেছেন। পরবর্তীতে তাঁরা প্রধানমন্ত্রী, অন্যান্য মন্ত্রী, মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি নিয়োগ দিয়েছেন। নিয়োগ দিয়েছেন যুদ্ধ ও সরকার পরিচালনার জন্য সেক্টর কমান্ডার্স, সেক্রেটারি, ডেপুটি সেক্রেটারী সহ প্রয়োজনীয় সকল পদে। মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পে প্রশিক্ষনে যোগ দিতে আসা প্রতিটি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন এই সরকারের সদস্য।
এই রাজনৈতিক নেতৃত্বেই মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে, বাংলাদেশের বিজয় এসেছে। জনগন আগেই তাঁদের ম্যান্ডেট দিয়েছিল সরকার গঠনের ও সংবিধান প্রণয়নের। সেই ম্যান্ডেটেই তাঁরা সরকার গঠন করেছিলেন এবং স্বাধীন রাষ্ট্রে সংবিধান রচনা করেছিলেন। এসবই আইনী বৈধতার ধারবাহিকতা।
আপনি গল্প শুনে বড় হতে পারেন- যুদ্ধের শুরুতেই শেখ মুজিব ব্রিফকেস গুছিয়ে পাকিস্তান চলে গেছে আর যুদ্ধের পুরো সময় রাজনীতিবিদরা কলকাতার হোটেলে মৌজ ফুর্তি করেছে।
নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা মুক্তিযুদ্ধকালে কে কোন দায়িত্বে ছিলেন তার একটি অসম্পুর্ণ তালিকা পাওয়া যায়- এ এস এম শামসুল আরেফিনের বই “মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ব্যক্তির অবস্থান”- এ।
গার্বেজ গিলে বেঁচে থাকার সিদ্ধান্ত প্রত্যেকের নিজের, এতে ইতিহাসের সত্য বদলায় না।
[ ছবি- ডা: আসহাব উল হক, এমপিএ, চুয়াডাঙ্গা। ১২ এপ্রিল ১৯৭১]






