সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপে ভারতকে টাইব্রেকারে ৪-৩ গোলে হারিয়ে সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপে টানা দ্বিতীয়বার শিরোপা কুড়ালো বাংলাদেশ। পুরো টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের আক্রমণভাগে নজর কাড়েন যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী ফুটবলার রোনান সুলিভান। ফাইনালে স্নায়ুক্ষয়ী টাইব্রেকারে ‘পানেনকা’ শটে দুর্দান্ত এক গোল করে বাংলাদেশকে শিরোপা জয়ের আনন্দে ভাসান তিনি। মালে জাতীয় স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে বসে রোনানের সেই জয়সূচক গোলটি উপভোগ করেন নানী সুলতানা আলম। যার কারণে লাল-সবুজ জার্সি গায়ে জড়িয়েছেন রোনান। ম্যাচ শেষে নানীর সঙ্গে ফ্রেমবন্দি হন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ার বাসিন্দা সুলিভান পরিবারের রয়েছে আলাদা ফুটবল ঐতিহ্য। এ পরিবারের চার ভাই ফুটবল খেলেন। তাদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত নাম কুইন সুলিভান ও কাভান সুলিভান। কুইন যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে যুব বিশ্বকাপে খেলেছেন এবং বর্তমানে মেজর সকার লীগের (এমএলএস) ক্লাব ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়নের হয়ে খেলছেন। কুইনের একটি সাক্ষাৎকারের সূত্র ধরেই সুলিভান পরিবারের সঙ্গে বাংলাদেশের নাড়ির টানের বিষয়টি প্রথম সামনে আসে। ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়নের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিওতে নিজেদের পারিবারিক শেকড় নিয়ে আলোচনা করেন কুইন। সেই আলোচনায় উঠে আসে তাদের বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত হওয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য। ওই ভিডিওর বর্ণনায় কুইন সরাসরি নাম উল্লেখ না করলেও ভালোবেসে তার নানির কথা বলেছিলেন। তিনি জানান, তার নানি মূলত ঢাকার মেয়ে। সেখান থেকে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়ে ভর্তি হন ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ায়। সেখান থেকেই পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন এবং পড়াশোনা শেষে জাতিসংঘেও কাজ করেন। পরবর্তী সময়ে জানা যায়, কুইনের সেই নানির নাম সুলতানা আলম। তিনি ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার জার্মান অধ্যাপক ক্লাউস ক্রিপেনডর্ফকে বিয়ে করেন। এই দম্পতির মেয়ের ঘরেই জন্মগ্রহণ করেন ফুটবল-পাগল চার ভাই কুইন, কাভান, রোনান ও ডেকলান সুলিভান। এই চার ভাইয়ের নানি সুলতানা আলম একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। বাংলাদেশের হয়ে খেলছেন যমজ ভাই ডেকলান ও রোনান, তারা আমেরিকায় বর্তমানে ওয়াইএসসি একাডেমিতে পড়াশোনা করছেন এবং এমএলএস নেক্সটের সহযোগী ক্লাব এফসি ডেলকোর হয়ে খেলেন। তাদের বাবা ব্রেন্ডান সুলিভান অস্ট্রেলিয়ার ‘এ’ লীগে ছয় বছরের পেশাদার ক্যারিয়ারে পাঁচটি ক্লাবে খেলেছেন। এর আগে তিনি ইউনিভার্সিটি অফ পেনসিলভ্যানিয়ায় খেলেছেন এবং পরে কোচ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। মা হেইকে ডিভিশন ওয়ান পর্যায়ে ফুটবল খেলেছেন এবং একই বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী দলের অধিনায়ক ছিলেন। তাদের এই পরিবারের ফুটবল ঐতিহ্য আরও বিস্তৃত। সুলিভানের চাচাতো ভাই ক্রিস অলব্রাইট যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ফুটবলার ছিলেন এবং ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়নের হয়ে খেলেছেন। এছাড়া তাদের নানা ল্যারি সুলিভান ভিলানোভা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান কোচ হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ফুটবল পরিবার থেকে দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপের অচেনা পরিবেশে নিজেকে উজ্জ্বলভাবে চেনালেন রোনান সুলিভান।
সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপ টুর্নামেন্টটি যেন এই বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত স্ট্রাইকারের জন্য ছিল প্রতিভা দেখানোর বড় মঞ্চ। রোনান যখন বাংলাদেশ যুব দলে ডাক পান, তখন তাকে ঘিরে কৌতূহলের শেষ ছিল না। তার নামের পাশে থাকা ‘আমেরিকান’ ট্যাগ এবং পেশাদার ফুটবল পরিবারের উত্তরাধিকার তকমা, প্রত্যাশার পারদ অনেক উঁচুতে ছিল। সেই চাপ সামলে নিয়েছেন দারুণভাবে। অল্প ক’দিনের অনুশীলন শেষে দলের সঙ্গে দারুণভাবে মানিয়ে নেন সুলিভান। সামর্থ্য প্রমাণেও বেশি সময় নেননি। অভিষেকে জোড়া গোল করে শুধু দলের ২-০ ব্যবধানের জয়ই নিশ্চিত করেননি, নিজের ইমপেক্ট বুঝিয়ে দেন। একটি দর্শনীয় ফ্রি-কিকে এবং অন্যটি চমৎকার হেডে। ভারতের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের ম্যাচেও অবদান ছিল রোনানের। তার নেয়া কর্নার থেকে সেন্টার ব্যাক রিয়াদ গোল করে দলকে সমতায় ফেরান। সেমিফাইনাল ও ফাইনালেও সুলিভানের বুদ্ধিদীপ্ত ফুটবল নজর কাড়ে দর্শকদের। বয়সভিত্তিক দলে খেলা সম্ভাবনাময় এবং প্রতিভাবান এ ফুটবলারকে জাতীয় দলে নেয়ার আগে প্রস্তুত করতে হবে। খেলার ম্যাচুরিটি থাকলেও শারীরিক কন্ডিশন নিয়ে ভাবতে হবে। নানি বাংলাদেশি হওয়ায় প্রতিটি গোলের পর লাল-সবুজ পতাকা নিয়ে রোনানের উল্লাস ছিল অকৃত্রিম। রোনানকে সঠিকভাবে পরিচর্যা করতে পারলে বাংলাদেশ জাতীয় দলের স্ট্রাইকার সংকটের সমাধান মিলতে পারে।






