নির্বাচনের বছরে বাংলাদেশকে নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে অস্বস্তিকর বার্তা দিয়েছে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ)। সংস্থাটির সদ্য প্রকাশিত ‘গ্লোবাল রিস্ক রিপোর্ট–২০২৬’-এ প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের জন্য প্রধানতম ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ‘অপরাধ ও অবৈধ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড’। গত কয়েক বছরে যেখানে মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট কিংবা কর্মসংস্থানের মতো অর্থনৈতিক বিষয়গুলোই ঝুঁকির শীর্ষে ছিল, সেখানে এবার সেগুলোকে পেছনে ফেলে এক নম্বরে উঠে এসেছে আইনশৃঙ্খলার অবনতি।
গতকাল বুধবার জেনেভা থেকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় প্রধান ঝুঁকি হিসেবে উঠে এসেছে ভূ-অর্থনৈতিক বিরোধ—যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কখনোই দেশের প্রথম পাঁচ ঝুঁকির তালিকায় ছিল না।
নিষেধাজ্ঞা, বাড়তি শুল্ক, বিনিয়োগ পর্যালোচনার মতো বৈশ্বিক টানাপোড়েন যে এখন সরাসরি বাংলাদেশের অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দিচ্ছে, তারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে এই প্রতিবেদনে। অন্য ঝুঁকিগুলোর মধ্যে রয়েছে মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক নিম্নগতি ও ঋণ।
ডব্লিউইএফের এই ঝুঁকি মূল্যায়ন কোনো পরিসংখ্যানগত পূর্বাভাস নয়; এটি মূলত দেশের শীর্ষ নির্বাহীদের ধারণাভিত্তিক মূল্যায়নের ফল। নির্বাহী মতামত জরিপে (ইওএস) অংশগ্রহণকারীদের আগামী দুই বছরে দেশের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি কী—তা চিহ্নিত করতে বলা হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেই ধারণার কেন্দ্রে এবার উঠে এসেছে অপরাধ।
ডব্লিউইএফের প্রতিবেদনে ‘অপরাধ’কে প্রধান ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা নিয়ে সরকারের ভেতরে অস্বস্তি স্পষ্ট। প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী এই মূল্যায়নে সন্তুষ্ট নন। তাঁর দাবি, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। জনঘনত্ব বেশি হওয়ায় অপরাধ পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব নয়—এমন যুক্তিও তুলে ধরেন তিনি।কিন্তু সরকারের এই ব্যাখ্যার সঙ্গে বাস্তব চিত্রের ফারাক ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। পুলিশ সদরদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে খুনের মামলা হয়েছে ৩ হাজার ৭৮৫টি, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। একই বছরে অপহরণের ঘটনা ঘটেছে ১ হাজার ১০২টি, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। আগের বছরের তুলনায় অপহরণ বেড়েছে ৭১.৬৫ শতাংশ। নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনাও রয়েছে উদ্বেগজনক মাত্রায়। এই পরিসংখ্যান কেবল সংখ্যা নয়; বরং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্রমাবনতির বাস্তব সাক্ষ্য, যা দেশের ব্যবসা-বিনিয়োগ পরিবেশ ও সামাজিক স্থিতিশীলতাকে সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
বাংলাদেশে ডব্লিউইএফের অংশীদার গবেষণা সংস্থা সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, সাম্প্রতিক সময়ে মব ভায়োলেন্স ও সামাজিক অপরাধের বিস্তার মানুষকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করেছে। তাঁর ভাষায়, এটি নির্বাচিত সরকারের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা। অপরাধের সঙ্গে অবৈধ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যুক্ত হয়ে যাওয়ার অর্থ হলো—অপরাধ এখন কেবল সামাজিক সমস্যা নয়, বরং অর্থনীতির ওপর সরাসরি আঘাত হানছে। অপরাধ বাড়লে বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, সরবরাহ চেইন ব্যাহত হয় এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। জরিপে অংশগ্রহণকারীরা সম্ভবত এই বাস্তবতাকেই বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
প্রতিবেদনটি আরও দেখাচ্ছে, বৈশ্বিক ভূরাজনীতির টানাপোড়েনে বাংলাদেশ ক্রমেই বেশি প্রভাবিত হচ্ছে। ভূ-অর্থনৈতিক বিরোধ বাড়লে বাংলাদেশের রপ্তানি, বৈদেশিক বিনিয়োগ ও সামগ্রিক অর্থনীতি চাপে পড়বে—এ আশঙ্কা জোরালো হচ্ছে। অথচ এ ধরনের বৈশ্বিক ঝুঁকি মোকাবিলায় অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা শক্ত না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। ডব্লিউইএফের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ টেনে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে বঞ্চিত বোধ এবং জীবনমান উন্নতির আশা হারানো মানুষই প্রতিবাদ ও বিক্ষোভের পথে হেঁটেছে। এটি কেবল রাজনৈতিক বার্তা নয়; বরং শাসন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যর্থতার প্রতিফলন।
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের এই প্রতিবেদন কোনো বিচ্ছিন্ন মূল্যায়ন নয়। বরং এটি দেশের ভেতরে জমে ওঠা অস্থিরতা, অপরাধপ্রবণতা ও শাসন সংকটের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। অপরাধকে প্রধান ঝুঁকি হিসেবে দেখানো মানে হলো—বাংলাদেশের উন্নয়ন বয়ান এখন নিরাপত্তাহীনতার দেয়ালে ঠেকছে। নির্বাচনের বছরে এই সতর্কবার্তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি অস্বীকার নয়, বরং কার্যকর পদক্ষেপই এখন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। নইলে ‘উন্নয়ন’ ও ‘স্থিতিশীলতা’র সরকারি দাবির সঙ্গে বাস্তবতার দূরত্ব আরও বেড়ে যাবে—যার মাশুল দিতে হবে পুরো অর্থনীতি ও সমাজকে।