স্বপ্ন প্রতিদিন ডেস্ক
তীব্র শীতে ঠাণ্ডাজনিত রোগে গত তিন দিনে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অন্তত ১০৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন আরও ১ হাজার ৪২১ জন রোগী। বরফশীতল হাওয়া ও ঘন কুয়াশায় উত্তরাঞ্চলে শীতজনিত এই স্বাস্থ্য সংকট ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। তবে এই দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়লেও দরিদ্র মানুষের পাশে নেই পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা কিংবা জনপ্রতিনিধিদের সক্রিয় উপস্থিতি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দেশে বর্তমানে অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকার থাকায় মাঠপর্যায়ে জনপ্রতিনিধিদের কার্যকর তৎপরতা নেই। ফলে শীতবস্ত্র বিতরণ, খোঁজখবর নেওয়া কিংবা জরুরি সহায়তা কার্যক্রম অনেকটাই প্রশাসননির্ভর ও সীমিত হয়ে পড়েছে।
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান জানান, মেডিসিন ও শিশু ওয়ার্ডে রোগীর চাপ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। শুধু ১ থেকে ৩ জানুয়ারি, এই তিন দিনে ওই দুই ওয়ার্ডেই ৩৭ জন রোগী মারা গেছেন। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট, সর্দি–কাশি ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। পর্যাপ্ত শয্যা ও জনবল সংকটে অনেক রোগীকে বারান্দা ও মেঝেতে রেখেই চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।
রংপুর আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সকালে বিভাগের বিভিন্ন জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১০ থেকে ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ছিল। নীলফামারীর সৈয়দপুরে সর্বনিম্ন ১০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। আবহাওয়া অফিসের ইনচার্জ মোস্তাফিজার রহমান বলেন, “দিন ও রাতের তাপমাত্রার ব্যবধান কমে যাওয়ায় শীতের অনুভূতি আরও বেড়েছে। আগামী কয়েক দিন ঘন কুয়াশা অব্যাহত থাকতে পারে।” জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা গোলাম কিবরিয়া জানান, এ পর্যন্ত ১২ হাজার ৫০০ কম্বল বিতরণ করা হয়েছে এবং আটটি উপজেলার জন্য ৪৮ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দা ও স্বেচ্ছাসেবীরা বলছেন, এই সহায়তা চাহিদার তুলনায় নগণ্য। বিশেষ করে চরাঞ্চল ও বস্তিবাসীদের বড় একটি অংশ এখনো কোনো শীতবস্ত্র পায়নি।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, সরকারি সহায়তা ও জনপ্রতিনিধিদের সক্রিয়তা না বাড়লে এই শীত উত্তরাঞ্চলের দরিদ্র মানুষের জন্য আরও প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। এক চরবাসী শাহিদা বেগম বলেন, “কেউ এসে খোঁজ নেয় না। আগে এমপি, চেয়ারম্যানরা অন্তত শীতে আসত। এখন শুধু শুনি বরাদ্দ হয়েছে, কিন্তু আমাদের হাতে কিছু আসে না।”
স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, দেশে নির্বাচিত সংসদ ও জনপ্রতিনিধি না থাকায় মাঠপর্যায়ে রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা ও তদারকি কমে গেছে। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা বা জেলা পর্যায়ে অনেক জায়গায় প্রশাসনের বাইরে কোনো কার্যকর সমন্বয় নেই।
স্থানীয় সমাজকর্মী মারুফ আহমেদ বলেন, “শীতে মৃত্যু বাড়লেও জনপ্রতিনিধিদের কোনো তৎপরতা চোখে পড়ছে না। অনির্বাচিত সরকারের বাস্তবতায় সবাই দায় এড়ানোর চেষ্টা করছে।” তিস্তা, ধরলা ও যমুনা নদীর চরাঞ্চলের নিম্নআয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন। কাজের সুযোগ কমে যাওয়ায় আয় কমেছে, অন্যদিকে শীতবস্ত্র কেনার সামর্থ্যও নেই।
পঞ্চগড়ের ইজিবাইক চালক তরিকুল ইসলাম বলেন, “ঠান্ডার কারণে মানুষ বাইরে বের হয় না। আয় নেই, গরম কাপড় কেনার টাকাও নেই।”
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, তাপমাত্রা আরও কমলে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে পারে। পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র বিতরণ, চরাঞ্চলে বিশেষ উদ্যোগ এবং হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি হয়ে উঠেছে।