1. admin@shwapnoprotidin.com : admin : ddn newsbd
শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬, ০৪:২১ অপরাহ্ন

হাওরে ৬০% ফসল নষ্ট, সর্বস্বান্ত কৃষক

প্রতিবেদকের নাম :
  • আপডেটের সময় : সোমবার, ৪ মে, ২০২৬
  • ৩৪ সময় দর্শন
স্বপ্ন প্রতিদিন ডেস্ক

সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে সাম্প্রতিক প্রাকৃতিক দুর্যোগে বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির বাস্তব চিত্র আড়াল করতে সরকারি প্রতিবেদনে ‘সংখ্যার খেলা’ চলছে এমন অভিযোগ উঠেছে কৃষক, সুধীজন ও হাওর সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে।

ভুক্তভোগীদের দাবি, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ গোপন রাখতে এবং সরকারি প্রণোদনা সীমিত রাখতে কৃষি বিভাগের প্রতিবেদনে ধান কাটার হার অস্বাভাবিকভাবে বেশি দেখানো হয়েছে।

একইভাবে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্রও আড়াল করে যতসামান্য ক্ষতি দেখানো হয়েছে। অথচ কৃষকদের মতে হাওরের ৬০ প্রায় ৬০ ভাগ বোরো ফসলের ক্ষতি হয়েছে। এতে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে। অথচ সরকারি হিসেবে মাত্র ৩শ কোটি টাকার ক্ষয় ক্ষতি দেখানো হয়েছে। যা বাস্তবতা বর্জিত বলে জানিয়েছেন কৃষকরা।

ভুক্তভোগী কৃষকরা জানান, গত ২৫ থেকে ৩০শে এপ্রিলের মধ্যে হাওরে দ্বিতীয় দফা জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। এতে অবশিষ্ট পাকা ধান পানিতে তলিয়ে যায়। এর আগেই গুরমা, টাঙ্গুয়ার ও পাগনার হাওরে কাঁচা ফসল জলাবদ্ধতায় নষ্ট হয়েছিল।

২৮শে এপ্রিল পর্যন্ত ছিল সরকার ঘোষিত দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার সময়। বিশেষ করে ২৭ ও ২৮শে এপ্রিল ভয়াবহ বৃষ্টি ও বজ্রপাতের কারণে কৃষকরা হাওরে নামতেই পারেননি। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী ২৮শে এপ্রিল পর্যন্ত ভারী বর্ষণ ও বন্যার শঙ্কা ছিল, যা পরে ৩০শে এপ্রিল পর্যন্ত বাড়ানো হয়।

এই পরিস্থিতিতে কৃষি বিভাগের ধান কাটার অগ্রগতির তথ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। হাওর আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ জানান, দুর্যোগের মধ্যেই প্রতিবেদনে ধান কাটার হার অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে, যা বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

২৫শে এপ্রিল যেখানে হাওরে ধান কাটার হার ছিল ৩৬.৯০৮ শতাংশ, সেখানে ২৬শে এপ্রিল তা দেখানো হয়েছে ৪৫.৩২৩ শতাংশ। ২৭শে এপ্রিল ৫২.৫৭৫, ২৮শে এপ্রিল ৫৬.২০১, ২৯শে এপ্রিল ৫৯.৬৬০ এবং ৩০শে এপ্রিল ৬২.৮৩৩ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। একইভাবে নন-হাওর এলাকাতেও প্রতিদিন ধারাবাহিকভাবে কাটার হার বাড়ার তথ্য দেওয়া হয়েছে।

ভুক্তভোগী ও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা জানান, ২৬ থেকে ২৯শে এপ্রিল পর্যন্ত টানা দুর্যোগের কারণে কেউই হাওরে নামতে পারেননি। এই সময়ে বরং অধিকাংশ ফসল পানিতে তলিয়ে যায়। ফলে সরকারি প্রতিবেদনের এই অগ্রগতি ‘মনগড়া’ বলেই জানান তারা।

কৃষি বিভাগের ৩রা মে পর্যন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জেলায় মোট আবাদকৃত ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টরের মধ্যে প্রায় ৬২ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। ক্ষতির পরিমাণ দেখানো হয়েছে ১৮ হাজার ৯৩০ হেক্টর। তবে স্থানীয় কৃষক ও হাওর আন্দোলনের নেতাদের দাবি, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ প্রায় লাখ হেক্টরের বেশি হবে।

কৃষকদের অভিযোগ, ডুবে যাওয়া ফসলের মায়া ছেড়ে যে ধান তারা কেটেছেন, সেটিও অতিরিক্ত খরচে তুলতে হয়েছে এবং রোদ না থাকায় সেই ধান পানিতে পচে আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে কাটা ও মাড়াই করা ধানে অঙ্কুর গজানোয় ক্ষতির পরিমাণ বেড়েছে। ফলে ক্ষতির মাত্রা সরকারি হিসাবে প্রতিফলিত হয়নি।

দেখার হাওরের শিয়ালমারা এলাকার কৃষক আশরাফুল মিয়া বলেন, ৪-৫ দিন কেউ ক্ষেতেই নামতে পারিনি। পরে পানি কমলেও ধান কাটার মতো অবস্থা ছিল না। আমার ৬ কেয়ারের মধ্যে ৪ কেয়ার ডুবে গেছে। যে দুই কেয়ার কাটছি, সেগুলাও শুকাতে না পেরে নষ্ট হচ্ছে। বেশি টাকায় শ্রমিক কাজে লাগাতে হয়েছে। তারপরও রোদের অভাবে পচে নষ্ট হয়ে গেছে। কাটা ধানের অর্ধেক ফলনও পাবো না।

ইসলামপুর গ্রামের বর্গাচাষী আমনুল্লাহ বলেন, ২৬ তারিখের পর ৩০ তারিখ পর্যন্ত হাওরে নামতে পারিনি। পরে গিয়ে দেখি সব পানির নিচে। ১০ কেয়ারের মধ্যে ৭ কেয়ার ধান তলিয়ে গেছে। যা তুলছি, তাও পচে গেছে। এবছর চলা খুবই মুশকিল হবে।

হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের সভাপতি রাজু আহমেদ বলেন, ২৭ থেকে ২৯শে এপ্রিলের মধ্যে অর্ধেকের বেশি ধান নষ্ট হয়েছে। কিন্তু কৃষি বিভাগ উল্টো ধান কাটার হার বাড়িয়ে দেখিয়েছে এবং ক্ষতির পরিমাণ কমিয়েছে। এটি স্পষ্টতই বাস্তবতা আড়াল করার চেষ্টা।

তিনি আরও বলেন, সরকার যেখানে কৃষকদের জন্য তিন মাসের প্রণোদনার কথা বলছে, সেখানে প্রকৃত ক্ষতির তথ্য গোপন করা হচ্ছে। এটা কার স্বার্থে করা হচ্ছে কৃষকরা জানতে চান।

অভিযোগের বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. ওমর ফারুক বলেন, ইউনিয়ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই প্রতিবেদন তৈরি হয়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, ডুবে যাওয়া ও কাটা ধান পচে নষ্ট হওয়ার ঘটনা ঘটেছে এবং পূর্ণাঙ্গ ক্ষয়ক্ষতির চিত্র পেতে আরও সময় লাগবে। ২৫শে এপ্রিলের পর বৃষ্টিপাত হয়েছে বলে স্বীকার করেন তিনি।

দুর্যোগের সময় যখন কৃষক মাঠে নামতেই পারেননি, তখন কাগজে-কলমে ধান কাটার হার কীভাবে বাড়তে থাকে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের রিপোর্ট ঠিক আছে।

এদিকে স্থানীয়দের আশঙ্কা, প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি আড়াল করে সরকারি সহায়তা কমিয়ে আনতেই এই ‘লুকোচুরি’ চলছে। এর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হচ্ছেন হাওরাঞ্চলের প্রান্তিক কৃষকরাই।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর
২০২5© এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ*
ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: Smart iT Host