স্টাফ রিপোর্টার
দেশে ভোজ্যতেলের ক্রমবর্ধমান চাহিদা ও আমদানিনির্ভরতা কমাতে নতুন সম্ভাবনার নাম হয়ে উঠছে সূর্যমুখী। খুলনা অঞ্চলের লবণাক্ত ও দীর্ঘদিন পতিত থাকা জমিতে এবার বাম্পার ফলন হয়েছে সূর্যমুখীর। বিশেষ করে ডুমুরিয়া, ফুলতলা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও নড়াইল অঞ্চলে কৃষকদের মুখে এখন হাসি ফুটিয়েছে হলুদ ফুলের এই অর্থকরী ফসল।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও ‘পার্টনার’ প্রকল্পের সহায়তায় এ অঞ্চলের হাজারো কৃষক প্রথমবারের মতো সূর্যমুখী চাষে যুক্ত হয়েছেন। সরকারি সহায়তায় কৃষকদের দেওয়া হয়েছে বীজ, সার, কীটনাশক ও প্রশিক্ষণ। ফলে যেসব জমি আগে আমন ধান কাটার পর বছরের পর বছর অনাবাদি পড়ে থাকতো, সেসব জমিতেই এখন দুলছে হাজার হাজার সূর্যমুখী ফুল।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, খুলনা অঞ্চলের প্রায় ৫৭ শতাংশ জমি লবণাক্ত। সাধারণত আমন ধান কাটার পর খরিপ-১ মৌসুমে প্রায় আড়াই লাখ হেক্টর জমি পতিত থাকে। তবে সূর্যমুখী ১৫ ডিএস পার মিটার পর্যন্ত লবণাক্ততা সহ্য করতে পারায় এটি এখন উপকূলীয় অঞ্চলের অন্যতম সম্ভাবনাময় ফসল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলার বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ জমিজুড়ে ফুটে আছে হলুদ সূর্যমুখী। দূর থেকে মনে হয় যেন প্রকৃতি হলুদ গালিচা বিছিয়ে দিয়েছে। স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, কম খরচ ও স্বল্প সেচে ভালো ফলন হওয়ায় সূর্যমুখী এখন তাদের কাছে লাভজনক বিকল্প ফসল হয়ে উঠছে।
খুলনার ফুলতলা উপজেলার কৃষক রেজাউল করিম বলেন,
“আগে জমি ফাঁকা পড়ে থাকতো। এবার প্রথম সূর্যমুখী করেছি। খরচ কম, ফলন ভালো। ধানের চেয়ে দ্বিগুণ লাভ হবে বলে আশা করছি।”
নড়াইল সদর উপজেলার কৃষক কামরুল ইসলাম বলেন,
“লবণাক্ততার কারণে আগে কিছু চাষ করতে ভয় পেতাম। এবার কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শে সূর্যমুখী করেছি। ফলন দেখে আমি নিজেই অবাক।”
কৃষি কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, এক বিঘা জমিতে সূর্যমুখী চাষে মোট খরচ হয় ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা। ভালো ফলন হলে প্রতি বিঘায় পাওয়া যায় প্রায় সাড়ে ৭ থেকে ৮ মণ বীজ। এক কেজি বীজ থেকে প্রায় ৪০০ গ্রাম তেল উৎপাদন সম্ভব। বর্তমান বাজারদরে এক বিঘা জমি থেকে প্রায় ৩০ থেকে ৩২ হাজার টাকার তেল পাওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি খৈল ও শুকনো গাছ জ্বালানি হিসেবেও ব্যবহারযোগ্য।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খুলনা অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন,
“সূর্যমুখী লবণাক্ততা সহনশীল হওয়ায় উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য এটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় ফসল। আমন পরবর্তী পতিত জমিগুলো আবাদে আনতে পারলে দেশে ভোজ্যতেলের উৎপাদনে বড় পরিবর্তন আসবে।”
পার্টনার প্রকল্পের সিনিয়র মনিটরিং অফিসার মো. মোসাদ্দেক হোসেন বলেন,
“বাংলাদেশে ভোজ্যতেলের প্রায় ৮৫ শতাংশ আমদানি করতে হয়। বছরে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকার তেল বিদেশ থেকে আনতে হয়। পতিত জমিতে সূর্যমুখী চাষ বাড়ানো গেলে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় সম্ভব হবে।”
কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সূর্যমুখী শুধু অর্থনৈতিকভাবেই লাভজনক নয়, এটি জমির উর্বরতাও বৃদ্ধি করে। গভীর শিকড় মাটির নিচের স্তর থেকে পুষ্টি টেনে আনে এবং পরবর্তী ফসলের জন্য জমিকে আরও উপযোগী করে তোলে।
সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামীতে খুলনা অঞ্চলের আরও বিস্তীর্ণ জমিতে সূর্যমুখী চাষ সম্প্রসারণ করা হবে। কৃষকদের আশা—এই “হলুদ বিপ্লব” একদিন দেশের ভোজ্যতেলের বাজারেও বড় পরিবর্তন আনবে।