বিশেষ প্রতিনিধি
মেহেরপুরের মুজিবনগরে জামায়াত আমির তাহাজ উদ্দিনের প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসায় তিন ছেলে শিশুকে ধর্ষণ করেছে ওই মাদ্রাসার শিক্ষক এক জামায়াত নেতা। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী বৃহষ্পতিবার রাতে মাদ্রাসা ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেছেন। এদিকে, ধর্ষিত শিশুদের পক্ষে ন্যায়বিচার চাওয়ায় জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসীরা স্থানীয়দের হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ এসেছে। বৃহস্পতিবার রাতে মুজিবনগর কেদারগঞ্জ বাজারে মুজিবনগর আইডিয়াল মাদ্রাসা ও দারুল হিফজখানা বোর্ডিং ঘেরাওয়ের এ ঘটনা ঘটে।
স্থানীয়রা জানান, মেহেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা জামায়াতের আমির তাহাজ উদ্দিন ওই মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা। এতে জামায়াত-শিবিরের নেতারাই শিক্ষকতা করেন। এই মাদ্রাসায় আরবি পড়ান জামায়াত নেতা নূর উদ্দিন। তিনি কোমলমতি ছেলে শিশুদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে একাধিকজনকে বলাৎকার করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে এ কাজ করে আসছিলেন। তবে লোকলজ্জায় অনেক শিক্ষার্থী-অভিভাবক বিষয়টি চেপে গেছেন। অনেকে জামায়াত-শিবিরের ভয়েই প্রতিবাদ করতেন না।
সম্প্রতি ভুক্তভোগী এক শিশুর অভিভাবক বাদী হয়ে বলাৎকারকারী ওই জামায়াত নেতা-শিক্ষকের বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা করেন। এতে ওই শিক্ষককে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানোর পাশাপাশি মাদ্রাসা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ভুক্তভোগী একাধিক শিশুকে। যারা দিনের পর দিন ওই মাদ্রাসায় জামায়াত নেতা নূর উদ্দিনের লালসার শিকার হয়ে আসছিল। গ্রেপ্তারকৃত নূর উদ্দিন নেত্রকোনা জেলার পূর্বধলা উপজেলার টেংগাচোড়া গ্রামের আব্দুল মজিদের ছেলে। তিনি জামায়াতের দায়িত্বশীল নেতা।
স্থানীয়রা জানান, বিভিন্ন জেলার শিশুরা জামায়াত আমিরের এই বোর্ডিং মাদ্রাসায় থেকে পড়াশুনা করে। তারা মাদ্রাসায় আবাসিকেই থাকে। এই সুযোগে নূর উদ্দিনসহ জামায়াতপন্থী শিক্ষকরা শিশুদের বলাৎকার করে। বৃহস্পতিবার রাতে তিন শিশুকে ধর্ষণের ঘটনা জানাজানি হলে মাদ্রাসাটি ঘেরাও করে বিক্ষুব্ধ লোকজন। তবে জামায়াত নেতা ও স্থানীয় এমপির মালিকানাধীন হওয়ায় বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায় জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসীরা। এ সময় পুলিশ পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিলে বিক্ষুব্ধরা ঘটনার বিচার এবং জড়িত শিক্ষকদের গ্রেপ্তারের দাবিতে মুজিবনগর থানা ঘেরাও করে জামায়াত-শিবিরসহ মাদ্রাসার ধর্ষক শিক্ষকদের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন। ভুক্তভোগী শিশুর বাবা ও মামলার বাদী বলেন, তার ছেলে ওই মাদ্রাসার পঞ্চম শ্রেণির হিফজ বিভাগে পড়াশুনা করে। বৃহস্পতিবার রাতে আরেক ছাত্রের অভিভাবকের মাধ্যমে মাদ্রাসায় ‘শিশু ধর্ষণের’ ঘটনা শুনে রাত ৩টার দিকে সেখানে গিয়ে তিনি তার ১০ বছরের ছেলেকে উদ্ধার করেন। শিশুটি তার পরিবারকে জানিয়েছে, বোর্ডিংয়ের আরবি শিক্ষক নূর উদ্দিন তাকেসহ তিন ছাত্রকে মাঝেমধ্যেই গভীর রাতে ‘রুমে নিয়ে খারাপ কাজ’ করে। এমনকি ঘটনার দিনও ওই শিক্ষক তার সঙ্গে ‘৩-৪ বার খারাপ কাজ’ করেছে। স্থানীয় বাসিন্দা শরিফুল ইসলাম এবং মাজেদুর রহমান জানান, তারা মুজিবনগর বাজার থেকে বাড়ি ফিরছিলেন। এ সময় কয়েকজনকে মাদ্রাসার দিকে ছুটতে দেখেন। তারা জানান ওই মাদ্রাসায় ছাত্রদের সঙ্গে ‘খারাপ কাজ’ করা হচ্ছে। ছেলেদের বাঁচাতে তারা স্থানীয়দের সাহায্য চান। তাদের আকুতি শুনে শত শত মানুষ সেখানে জড়ো হয়ে মাদ্রাসা ঘেরাও করেন। তখন জামায়াত কর্মীরা সেই শিক্ষককে উদ্ধার করে উল্টো স্থানীয়দের উপর হামলা করে। এক পর্যায়ে জনগণের রোষের মুখে এবং পুলিশের উপস্থিতিতে জামায়াত কর্মীরা পিছু হটে গেলেও পুলিশ এসে জামায়াত নেতাদের রক্ষা করে।
এ ঘটনায় স্থানীয়রা পরে থানা ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেন। জনরোষে বাধ্য হয়ে পুলিশ মাদ্রাসায় ঢুকে সেই অভিযুক্ত শিক্ষককে আটক করে এবং নির্যাতিত শিশুদের উদ্ধার করে। এসময় বিক্ষুব্ধ লোকজন বিচারের দাবিতে মুজিবনগর থানা ঘেরাও করে জামায়াতের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন। স্থানীয়রা জানান, এমন অভিযোগ তারা প্রায়ই শুনতেন। জামায়াতের আমিরসহ সবাই জানতো। কোমলমতি শিশুরা নিয়মিত ধর্ষিত হলেও চুপ থাকেন প্রতিষ্ঠাতা।
মুজিবনগর উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মো. খায়রুল বাশার বলেন, রাতেই এই ঘটনা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ার ছড়ানো হয় মাদ্রাসাটি জামায়াতের আমিরের। জামায়াতের কর্মীরা এটা মিথ্যা দাবি করতে ঘটনাস্থলে গেলে একটু গন্ডগোল হয়। মাদ্রাসার পরিচালক জামায়াতের আমিরের বড় ভাই সেলিম হোসেন খাঁন বলে জানান তিনি। অধ্যক্ষ হাফেজ বায়োজিত হোসেন বলেন, এ ধরনের ঘটনা আগে ঘটলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হতো। আমরা মাদ্রাসা ঘেরাওয়ের পর ঘটনা শুনেছি। শিক্ষার্থী ধর্ষণের অভিযোগে মাদ্রাসার শিক্ষকের বিরুদ্ধে থানায় মামলা হয়েছে। সেই শিক্ষক গ্রেপ্তার হয়েছেন।
ওসি জাহিদুল ইসলাম বলেন, জামায়াত আমিরের মালিকানাধীন মাদ্রাসায় এই ঘটনায় শিশুর অভিভাবক বাদী হয়ে থানায় ধর্ষণ মামলা করেছেন। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে ওই শিক্ষক প্রায়ই মাদ্রাসার ছাত্রদের গভীর রাতে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করত। ওসি জানান, শিক্ষককে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। ভুক্তভোগী শিশুদের ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পাঠিয়ে ২২ ধারায় জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে।