জানা যায়, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সম্রাট হোসেনের পাঠানো সুপারিশের ভিত্তিতে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা শেখ আব্দুল কাদের গত ৫ মার্চ ‘বাকোশপোল বালক-বালিকা এতিমখানা’ ও ‘বাকোশপোল হাফিজিখানা’ নামে দুটি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে এই বরাদ্দ দেন। পরে ১১ মার্চ সরকারি গুদাম থেকে চাল সরবরাহের আদেশে স্বাক্ষর করেন ইউএনও।
অভিযোগ রয়েছে, বাকোশপোল এলাকার ‘বাকোশপোল বাগে জান্নাত মহিলা কওমি মাদরাসা ও এতিমখানা’ এবং ‘বাকোশপোল এমদাদুল উলুম কওমি মাদরাসার নাম পরিবর্তন করে দেবীদাসপুর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি পরিচয়দানকারী মোদাচ্ছের গাজী দুই টন জেনারেল রিলিফ (জিআর) চাল বরাদ্দ নেন। এ ক্ষেত্রে তিনি সংশ্লিষ্ট দুই প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করেননি।
নিয়ম অনুযায়ী, ইউএনও দপ্তরে আবেদন জমা পড়ার পর তা যাচাই করে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) মাধ্যমে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পাঠানোর কথা। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আবেদন যাচাই না করেই ইউএনও স্বাক্ষরিত সুপারিশের তালিকা জেলা প্রশাসকের দপ্তরে পাঠিয়েছেন পিআইও দপ্তরের অফিস সহকারী বোরহান উদ্দিন।
বাকোশপোল বাগে জান্নাত মহিলা কওমি মাদরাসা ও এতিমখানার প্রধান শিক্ষক আব্দুল্লাহ বলেন, সরকারি চালের জন্য আমি কোনো আবেদন করিনি। দেবীদাসপুর গ্রামের মোদাচ্ছের গাজী ঈদের আগে আমাকে মনিরামপুরে নিয়ে গিয়ে একটি কাগজে তিনটি স্বাক্ষর করান। পরে জানতে পারি আমার মাদরাসার নামে এক টন চাল বরাদ্দ হয়েছে। কিন্তু আমি কোনো চাল পাইনি। তিনি বলেন, পরে ওই দিন রাতে মোদাচ্ছের এসে আমাকে পাঁচ হাজার টাকা দিতে চেয়েছিলেন। আমি তা ফিরিয়ে দিয়েছি।
আব্দুল্লাহ আরও বলেন, বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর মোদাচ্ছের তার মাদরাসায় একটি অজুখানা করে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন।
এদিকে বাকোশপোল এমদাদুল উলুম কওমি মাদরাসার প্রধান শিক্ষক মফিজুর রহমান বলেন, আমরা সরকারি চালের জন্য কোনো আবেদন করিনি। কয়েক দিন আগে সাংবাদিক এসে আমাকে চালের বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে জানতে পারি মোদাচ্ছের নামে এক ব্যক্তিকে সভাপতি করে আমাদের মাদরাসার নাম পরিবর্তন করে বাকোশপোল হাফিজিখানা দিয়ে এক টন চাল বরাদ্দ হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, মোদাচ্ছের গাজী আমাদের কমিটির কেউ নন। আমাদের মাদরাসার বর্তমান সভাপতি মকবুল হোসেন।
মফিজুর রহমানের দাবি, বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর মোদাচ্ছের তার কাছেও পাঁচ হাজার টাকা দিতে চেয়েছিলেন। তবে তিনি তা নেননি।
এ বিষয়ে মোদাচ্ছের গাজী বলেন, আমার পরিচিত এক ব্যক্তির মাধ্যমে বাকোশপোলের দুটি মাদরাসার জন্য চালের আবেদন করেছিলাম। পরে দুই টন চাল বরাদ্দ পাই। চাল বিক্রি করে প্রায় ৭০ হাজার টাকা পেয়েছি। দুই মাদরাসার প্রধানদের বরাদ্দ বুঝিয়ে দিয়েছি।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) সেলিম খান বলেন, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দে জিআরের সাত টন চাল মনিরামপুরের সাতটি প্রতিষ্ঠানে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আমি কয়েক দিন অসুস্থ ছিলাম। এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না। আমাকে না জানিয়ে অফিস সহকারী বোরহান উদ্দিন তালিকাটি জেলায় পাঠিয়েছে।
অফিস সহকারী বোরহান উদ্দিন বলেন, ইউএনওর দপ্তরে আবেদন জমা পড়ে। সেখান থেকে আবেদন তাদের দপ্তরে পাঠানো হয়। পিআইও অফিসে না থাকায় সময় স্বল্পতার কারণে আবেদন যাচাই করা সম্ভব হয়নি। পরে ইউএনওর স্বাক্ষরিত সুপারিশের তালিকা জেলা প্রশাসকের দপ্তরে পাঠানো হয়।
মনিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সম্রাট হোসেন ছুটিতে থাকায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার ব্যবহৃত সরকারি নম্বরে ফোন করলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা শেখ আব্দুল কাদের বলেন, জেনারেল রিলিফ (জিআর) চাল বরাদ্দের জন্য উপজেলা থেকে ইউএনও স্বাক্ষরিত তালিকা জেলায় পাঠানো হয়। সেই তালিকার ভিত্তিতে চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ দেওয়া হয়। তিনি বলেন, আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের দায়িত্ব ইউএনও বা পিআইও দপ্তরের। মনিরামপুরের বাকোশপোল এলাকায় দুটি অস্তিত্বহীন মাদরাসার নামে বরাদ্দের বিষয়টি শুনেছি। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মনিরামপুর থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান মিন্টু বলেন, মোদাচ্ছের গাজী বিএনপির রাজনীতি করেন। তার দলীয় পদ যাচাই করা হচ্ছে। চাল আত্মসাতের মতো অনৈতিক কাজে জড়িত থাকার প্রমাণ মিললে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।






