সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার
সদ্য বিদায়ী ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের চরম অব্যবস্থাপনা ও স্বাস্থ্য প্রশাসনের অদূরদর্শিতায় দেশের শিশু স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচিতে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। বিগত ৯ বছরের মধ্যে ২০২৫ সালে এসে শিশুদের নিয়মিত টিকাদান (ইপিআই) কর্মসূচি নজিরবিহীন ধসের মুখে পড়েছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে টিকাদানের জাতীয় গড় হার আশঙ্কাজনকভাবে কমে মাত্র ৫৯.৬ শতাংশে নেমে এসেছে।
৯ বছরে সর্বনিম্ন সাফল্য, ২০২৫ সালে হার নেমেছে ৬০ শতাংশের নিচে- ২০২৫ সালে টিকাদানের হার কমে ৫৯.৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ২০১৭-২০২২ পর্যন্ত টিকাদানের গড় হার ছিল ৯০ থেকে ১০০ শতাংশের উপরে। হাম ও রুবেলার (MR) টিকাদানে বড় ধরনের ঘাটতি লক্ষ্য করা গেছে। স্বাস্থ্য উপদেষ্টার অদক্ষতা ও মাঠ পর্যায়ে তদারকির অভাবকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। ৪০ শতাংশ শিশু এখন প্রাণঘাতী রোগের ঝুঁকিতে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের টিকাদান কর্মসূচির বিগত ৯ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০১৭ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ টিকাদানে আন্তর্জাতিকভাবে রোল মডেল হিসেবে পরিচিত ছিল। ২০১৭ সালে টিকাদানের হার ছিল ৮৯.৬ শতাংশ, যা ২০১৮ সালে ছিল ৮৯.৪ শতাংশ। ২০১৯ সালে এই হার বেড়ে দাঁড়ায় ৯০.৮ শতাংশে। ২০২০ সালে বিশ্বজুড়ে করোনা মহামারির মধ্যেও টিকাদানের হার ৮৬.৬ শতাংশ বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছিল তৎকালীন স্বাস্থ্য বিভাগ।
টিকাদানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সবচেয়ে বড় সাফল্য দেখায় ২০২১ ও ২০২২ সালে। ২০২১ সালে এই হার ছিল ১০০.৬ শতাংশ এবং ২০২২ সালে তা রেকর্ড ১০৩.৬ শতাংশে উন্নীত হয়। তবে ২০২৩ সাল থেকে এই সূচক নিচে নামতে শুরু করে এবং ওই বছর হার দাঁড়ায় ৯৩.৬ শতাংশ। ২০২৪ সালে ড. ইউনুসের নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর টিকাদানের হার কমে দাঁড়ায় ৮৬.৬ শতাংশ। সর্বশেষ ২০২৫ সালের প্রাক্কলিত বা বর্তমান তথ্যে দেখা যাচ্ছে, এই হার এক লাফে কমে মাত্র ৫৯.৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
প্রকাশিত চিত্রে দেখা গেছে, শিশুদের জীবন রক্ষাকারী বিসিজি (BCG), পেন্টা-১, পেন্টা-৩ এবং বিশেষ করে হাম ও রুবেলার (MR 1 ও MR 2) টিকার ক্ষেত্রে এই নিম্নমুখী প্রবণতা সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদানের হার ৯৫ শতাংশের নিচে নামলেই সংক্রামক ব্যাধির প্রাদুর্ভাব ঘটার ঝুঁকি থাকে। বর্তমানের ৫৯.৬ শতাংশ হার দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জনস্বাস্থ্যকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
সদ্য বিদায়ী সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টার ভূমিকা নিয়ে খোদ স্বাস্থ্য খাতের ভেতরেই তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। অভিযোগ উঠেছে, সংস্কারের নামে অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেওয়া এবং মাঠ পর্যায়ের টিকাদান কেন্দ্রগুলোর নিয়মিত কার্যক্রম তদারকি না করায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এই পরিসংখ্যান নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। নেটিজেনরা বলছেন, টিকাদানের এই সংকটের কথা যখন আগে বলা হয়েছিল, তখন সরকারের সমর্থক বা একটি বিশেষ গোষ্ঠী সমালোচকদের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু এখন সরকারি পরিসংখ্যানেই স্বাস্থ্য খাতের এই কঙ্কালসার অবস্থা ও চরম ব্যর্থতা ফুটে উঠেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, টিকাদান কর্মসূচির এই বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে হলে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। অন্যথায় পোলিও, হাম বা যক্ষ্মার মতো নির্মূল হওয়া রোগগুলো পুনরায় দেশে ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
দেশের সচেতন সমাজ ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সদ্য বিদায়ী সরকারের এই ‘উদাসীনতা’ বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের দীর্ঘদিনের অর্জনকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। এই বিশাল ঘাটতি পূরণ করাই এখন আগামীর প্রশাসনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।