ডেনমার্কের ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান নোভো নরডিস্কের ওজন কমানোর জনপ্রিয় ওষুধ উইগোভি ও ওজেমপিকের মূল উপাদান সেমাগ্লুটাইডের পেটেন্টের মেয়াদ গত শুক্রবার ভারতে শেষ হয়েছে। এর ফলে দেশটির প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এখন এই ওষুধের সস্তা জেনেরিক সংস্করণ তৈরি করে বাজারে আনতে পারবে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এর ফলে দামি এই ওষুধের দাম অর্ধেকেরও বেশি কমে যেতে পারে। ভারত ছাড়াও অন্যান্য দেশেও এই ওষুধের ব্যবহার দ্রুত বাড়তে পারে। ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক জেফারিজ বলছে, সঠিক মূল্য নির্ধারণ ও চাহিদা তৈরি হলে শুধু ভারতেই সেমাগ্লুটাইডের বাজার ১০০ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই এই ওষুধের অন্তত ৫০টি জেনেরিক ব্র্যান্ড বাজারে আসতে পারে। ভারতের প্রতিযোগিতামূলক ওষুধ শিল্পে এটি খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। এর আগে ২০২২ সালে ডায়াবেটিসের ওষুধ সিটাগ্লিপটিনের পেটেন্ট শেষ হলে মাত্র এক মাসে প্রায় ৩০টি এবং এক বছরে ১০০টি জেনেরিক ব্র্যান্ডে বাজার ছেয়ে যায়।
বর্তমানে ভারতের ওষুধের বাজার ৬ হাজার কোটি ডলারের। প্রাক্কলন অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে এটি দ্বিগুণ হওয়ার কথা। এর ফলে এত দিন যে সেমাগ্লুটাইড শুধু ধনীরাই ব্যবহার করতে পারতেন, এখন তা সাধারণের হাতের নাগালে চলে আসতে পারে।
মূলত ডায়াবেটিসের চিকিৎসার জন্য তৈরি হলেও এই ওষুধগুলোকে এখন মানুষের ওজন কমানোর ক্ষেত্রে ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সেমাগ্লুটাইড ক্ষুধা ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনের মতো কাজ করে। এটি ইনসুলিন নিঃসরণ বাড়ায় এবং পাকস্থলী থেকে খাবার খালি হওয়ার গতি কমায়। ফলে ক্ষুধা কম অনুভূত হয়।
ভারতের সিপলা, সান ফার্মা, ড. রেড্ডিস, বায়োকন, নাটকো, জাইডাস ও ম্যানকাইন্ড ফার্মার মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলো এই জেনেরিক বাজারে আনতে সব প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে।
বর্তমানে বাজারে ওজেমপিকের জন্য মাসে খরচ হয় প্রায় ৮ হাজার ৮০০ থেকে ১১ হাজার রুপি। আর উইগোভির জন্য ১০ হাজার থেকে ১৬ হাজার রুপি। তবে সস্তা জেনেরিক বাজারে এলে এই খরচ কমে ৩ হাজার থেকে ৫ হাজারে নেমে আসতে পারে।
এই ওষুধগুলোর ব্যবহার এখন আর শুধু ডায়াবেটিসের চিকিৎসাতেই সীমাবদ্ধ নেই। কার্ডিওলজিস্টরা অস্ত্রোপচারের আগে ওজন কমাতে, অর্থোপেডিক সার্জনরা হাঁটু অস্ত্রোপচারের আগে চাপ কমাতে এবং বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞরা স্লিপ অ্যাপনিয়ার চিকিৎসায়ও এটি ব্যবহার করছেন।
ভারত বিশ্বের সবচেয়ে বড় জেনেরিক ওষুধ সরবরাহকারী দেশগুলোর একটি। বর্তমানে দেশটিতে প্রায় ৬০ হাজার ব্র্যান্ডের ওষুধ তৈরি হচ্ছে। বিশ্বে জেনেরিক ওষুধের প্রায় ২০ শতাংশই আসে ভারত থেকে। দুই দশক আগে ভারত এইচআইভি চিকিৎসার ওষুধের দাম কমিয়ে আফ্রিকা ও উন্নয়নশীল বিশ্বে রোগটির চিকিৎসা সহজলভ্য করেছিল।
ভারতের ওষুধ এখন প্রায় ২০০ দেশে রপ্তানি হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ৪০ শতাংশ এবং যুক্তরাজ্যের এক-চতুর্থাংশ ওষুধ আসে ভারত থেকে।
অবশ্য চিকিৎসকরা এই ওষুধ ব্যবহারে কিছু সতর্কতাও দিয়েছেন। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে বমি বমি ভাব, বমি এবং হজমের সমস্যা হতে পারে। এ ছাড়া কোনো কোনো ক্ষেত্রে পিত্তথলিতে পাথর বা অগ্ন্যাশয়ের নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। খুব দ্রুত ওজন কমলে পেশিক্ষয়ও হতে পারে। এ ছাড়া ওষুধ বন্ধ করলে অনেক সময় ক্ষুধা আবার বেড়ে যায় এবং ওজন আগের অবস্থায় ফিরে আসতে পারে।






