‘সকালে অর্ধেক পাউরুটি, অর্ধেক সাগরকলা আর একটা ডিম দিয়েছে। দুপুরে এক টুকরো ব্রয়লার মুরগির মাংস আর সামান্য একটু ভাত। এই খাবারে কি পেট ভরে? তাই বাধ্য হয়ে বাড়ি থেকে ভাত-তরকারি আনিয়ে খাচ্ছি।’ রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বিছানায় বসে আক্ষেপের সঙ্গে কথাগুলো বলছিলেন ষাটোর্ধ্ব রোগী আফজাল হোসেন। শুধু আফজাল নন, হাসপাতালের অন্তঃবিভাগে ভর্তি মোহসীন আলী (৫৮) ও লোকমান মণ্ডলসহ (৫২) অধিকাংশ রোগীর কণ্ঠে ঝরল একই বঞ্চনার সুর।
শুক্রবার দুপুরে সরেজমিন ৫০ শয্যাবিশিষ্ট এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায়, রোগীদের জন্য বরাদ্দকৃত খাবারে চলছে প্রচণ্ড অনিয়ম। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ঠিকাদার নিজের ইচ্ছামতো নিম্নমানের ও পরিমাণে কম খাবার সরবরাহ করছেন, যা নিয়ে রোগীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করে রোগীদের মুখে নিম্নমানের খাবার তুলে দেওয়া এক ধরনের অমানবিক অপরাধ।
দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে এই সিন্ডিকেট ভেঙে রোগীদের পুষ্টিকর ও পর্যাপ্ত খাবার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, শাহজাহান আলী নামে একজন ঠিকাদার রোগীদের পথ্য সরবরাহের দায়িত্বে রয়েছেন। সরকারি মেনু অনুযায়ী, সপ্তাহে ৭ দিন পালাবদল করে রুই মাছ, খাসির মাংস, সবজি ও ডাল-ভাত দেওয়ার কথা। প্রতিদিন নাশতায় একটি বড় পাউরুটি, একটি আস্ত মালভোগ কলা ও ডিম দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। দুপুরে ও রাতে জনপ্রতি ১০০ গ্রাম রুই মাছ অথবা ১০০ গ্রাম খাসির মাংস দেওয়ার বিধান থাকলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন নেই।
রোগীদের অভিযোগ, রুই মাছের পরিবর্তে কম দামি সিলভার কার্প এবং খাসির মাংসের পরিবর্তে ব্রয়লার মুরগি দেওয়া হচ্ছে। ১০০ গ্রাম মাংসের বদলে পাতে জুটছে মাত্র ২০ থেকে ৩০ গ্রাম। রোগী কামরুল হক (৫৬) ও বকুল মিয়া (৬০) বলেন, ‘সকালে আস্ত কলার বদলে দেওয়া হয় অর্ধেক সাগরকলা। দুপুরের খাবারে যা দেওয়া হয়, তাতে একজনের পেটও ভরে না।’ একই অভিযোগ করেন সুজলা এক্কা ও মনিরা বেগমসহ আরও অনেকে।
স্বাধীনতা দিবস বা ঈদের মতো বিশেষ দিনগুলোতে উন্নতমানের পোলাও, মাংস ও সেমাই দেওয়ার কথা থাকলেও সেখানেও হাত দিয়েছেন ঠিকাদার। ঈদুল ফিতরের দিনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে রোগী আতোয়ার রহমান ও জোবেদ আলী বলেন, ‘ঈদের সকালে ছোট মগে করে মাত্র আধা মগ সেমাই দেওয়া হয়েছে। সকালে খাসির মাংসের নামে ৩৫-৫০ গ্রামের এক টুকরো হাড়-চর্বি দেওয়া হলেও রাতে দেওয়া হয়েছে নামমাত্র ব্রয়লার মাংস।’ লাচ্ছা সেমাইয়ের পরিমাণও ছিল অত্যন্ত নগণ্য।
খাবারে অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে সরবরাহকারী ঠিকাদার শাহজাহান আলী সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমরা নির্দিষ্ট নিয়ম মেনেই খাবার দিচ্ছি। এরপরও যদি কেউ অভিযোগ করে, আমরা ভবিষ্যতে বিষয়টি আরও খেয়াল রাখব এবং প্রয়োজনে খাবারের পরিমাণ বাড়িয়ে দেব।’
বিষয়টি নিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মীর হোসেন বলেন, ‘খাবার তদারকি আমি নিজেই করছি। তবে মাঝেমধ্যে এ ধরনের অভিযোগ আমাদের কানে আসে। আমরা অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে দেখছি। যদি ঠিকাদারের পক্ষ থেকে কোনো অনিয়মের সত্যতা পাওয়া যায়, তবে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’