নিজস্ব প্রতিবেদক
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়েছে বাংলাদেশে। রাজধানী থেকে জেলা শহর—সর্বত্রই এখন একই চিত্র—কোথাও পাম্প বন্ধ, কোথাও সীমিত সরবরাহ, আর খোলা পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইনে তেল সংগ্রহে ভোগান্তি। দিনাজপুরের অভিজ্ঞতাকে কেস স্টাডি হিসেবে বিবেচনা করলে দেশের সার্বিক জ্বালানি তেল সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতাই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
ঢাকায় বিভিন্ন পাম্প ঘুরে দেখা গেছে, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অপ্রতুল থাকায় একাধিক পাম্পে কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। যেসব পাম্প খোলা আছে, সেগুলোতেও রেশনিং পদ্ধতিতে তেল বিক্রি করা হচ্ছে। এতে মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির দীর্ঘ সারি তৈরি হচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পরও অনেক ক্ষেত্রে তেল মিলছে না।
পাম্প সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্বাভাবিক সময়ে যেখানে প্রতিদিন কয়েক দশ হাজার লিটার তেলের চাহিদা থাকে, সেখানে ডিপো থেকে সরবরাহ আসছে তার তুলনায় অনেক কম। ফলে একদিন পর পর পাওয়া সীমিত বরাদ্দ দিয়েই একাধিক দিন চালাতে হচ্ছে পাম্পগুলোকে। এতে দ্রুতই তেল শেষ হয়ে যাচ্ছে এবং পাম্প বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন মালিকরা।
অন্যদিকে, খোলা পাম্পগুলোতে তেল থাকলেও তা পর্যাপ্ত নয়। নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে তেল বিতরণ করায় ভোক্তাদের মধ্যে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা এবং অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অনেক চালক জানিয়েছেন, দুই থেকে তিন ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও তেল শেষ হয়ে যাওয়ায় বঞ্চিত হচ্ছেন।
দেশের বিভিন্ন জেলায়ও একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এর মধ্যে দিনাজপুরের চিত্রটি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। জেলার অধিকাংশ ফিলিং স্টেশন বন্ধ থাকছে। যেগুলো চালু আছে, সেগুলোতেও রেশনিং পদ্ধতিতে সীমিত তেল দেওয়া হচ্ছে। ফলে কয়েক ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে সামান্য পরিমাণ তেল সংগ্রহ করতে হচ্ছে গ্রাহকদের।
পাম্প মালিকদের মতে, ডিপো থেকে সরবরাহ সীমিত হওয়ায় এবং রেশনিংয়ের কারণে বাজারে সরবরাহ দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। আগে যে পরিমাণ তেল বিক্রি হতে কয়েক দিন সময় লাগত, বর্তমানে তা এক থেকে দুই দিনের মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। এতে পাম্পগুলোর কার্যক্রম টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
এছাড়া ভোক্তাদের মধ্যে আতঙ্কজনিত চাহিদা বৃদ্ধিও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। অনেকেই প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তেল সংগ্রহ করছেন, ফলে বাজারে কৃত্রিম চাপ তৈরি হচ্ছে। আগে যেখানে তুলনামূলক কম পরিমাণে তেল কেনা হতো, এখন তা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকারের পক্ষ থেকে দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুদ থাকার কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। পাম্প বন্ধ, সীমিত সরবরাহ, রেশনিং এবং দীর্ঘ লাইন—সব মিলিয়ে সরবরাহ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংকট শুধু বৈশ্বিক বাজারের প্রভাব নয়; বরং অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, চাহিদা ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা এবং ভোক্তাদের আতঙ্কজনিত আচরণ মিলেই পরিস্থিতিকে তীব্র করেছে। বিশেষ করে ডিপো থেকে পাম্পে নিয়মিত ও পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত না হলে এমন সংকট আরও ঘনীভূত হতে পারে।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সমন্বিত সরবরাহ ব্যবস্থা, স্বচ্ছ রেশনিং এবং বাজারে আস্থার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অন্যথায়, জ্বালানি তেলের এই সংকট দৈনন্দিন জীবনের পাশাপাশি পরিবহন ও অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।






