বিশেষ প্রতিবেদক
আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটিয়ে ক্ষমতায় আসা ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যেসকল চুক্তি করেছে, তাতে বাংলাদেশের স্বার্থ ক্ষুণন্ন হয়েছে এবং এতে বাংলাদেশ প্রতিবছর বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়তে যাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে জানিয়েছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটির মতে, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার প্রস্তাবিত চুক্তিগুলো কার্যকর হলে সরকারের রাজস্ব আয়ে উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়বে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে অনেক পণ্যে শুল্ক কমানো বা শূন্য করার ফলে বাংলাদেশ সরকারের শুল্ক আয়ের একটি অংশ হারানোর ঝুঁকি তৈরি হবে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর বাংলাদেশ প্রায় ১০৮.৩ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১ হাজার ৩২৭ কোটি টাকা শুল্ক আদায় করেছে। আমদানির ধরন একই থাকলে ভবিষ্যতে কমপক্ষে এই পরিমাণ রাজস্ব হারানোর সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছে সিপিডি।
প্রসঙ্গত, চুক্তি সম্পাদন নিয়ে শুরু থেকেই দেশের সচেতন মহল তীব্র বিরোধিতা করে এলেও ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারে এসব প্রতিবাদকে গ্রাহ্য করেনি। বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের কর্মকর্তাসহ দেশটির বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সাথে দফায় দফায় বৈঠক চলেছে নির্বিঘ্নে।
চুক্তিটি নন ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট (প্রকাশযোগ্য নয়) হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে চিহ্নিত করা হয়। সেসময় সচিবালয়ের এক সিনিয়র সচিব চুক্তির কপি দেশের স্বার্থ বিবেচনায় প্রকাশ করে দিলে জনমনে চুক্তির বিরুদ্ধে তুমুল প্রতিবাদ দেখা দেয়। এরই প্রেক্ষিতে সেই সরকারি কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়।
ড. ফাহমিদা খাতুন জানান, বাংলাদেশ সম্প্রতি (ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়) যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘রেসিপ্রোকাল ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট’ স্বাক্ষর করেছে। এ চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত প্রায় সাড়ে ৪ হাজার পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিতে হবে। পাশাপাশি আগামী ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে আরও ২ হাজার ২১০ ধরনের পণ্যে শুল্ক ছাড় দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে একতরফাভাবে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা দেওয়া হয়েছে, যা ডব্লিউটিওর নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। এর ফলে ডব্লিউটিওর আওতাভুক্ত অন্যান্য দেশকেও একই সুবিধা দিতে বাধ্য হতে পারে বাংলাদেশ।
রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে ফাহমিদা খাতুন বলেন, চলতি অর্থবছরের জানুয়ারি পর্যন্ত রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি ১২.৯ শতাংশ, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৪.৫ শতাংশ হারে। বাকি সময়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে ৫৯.৪ হারে রাজস্ব আদায় করতে হবে। যা অসম্ভব। কারণ এখন পর্যন্ত রাজস্ব ঘাটতি ৬০ হাজার কোটি টাকা দাঁড়িয়েছে। বাকি সময়ে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ চ্যালেঞ্জিং বিষয়।
বক্তব্যে ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, জনগণ যে পরিমাণ কর দেন তার বড় একটি অংশ নানা লিকেজের কারণে সরকারের কোষাগারে পৌঁছায় না। কর ফাঁকি রোধ, প্রশাসনের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও কর ব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশন নিশ্চিত করা গেলে রাজস্ব আদায় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। তিনি আরও বলেন, ভ্যাটসহ বিভিন্ন উৎস থেকে কর আদায়ে যে ঘাটতি রয়েছে, তা দূর করতে পারলে নতুন করে করের হার বাড়ানোর প্রয়োজন অনেকটাই কমে যাবে। তাই কর বাড়ানোর আগে রাজস্ব ব্যবস্থার ফাঁক বন্ধ জরুরি।
উল্লেখ্য, ড. ইউনূসের সময় করা বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী এই চুক্তির সাথে নিজেদের সম্পৃক্ততা আড়াল করতে জামায়াতে ইসলামীর উঠেপড়ে লেগেছে। যুদ্ধাপরাধী দলটির আমির শফিকুর রহমান সম্প্রতি এ প্রসঙ্গে দাবি করেন, চুক্তির বিষয়ে তারা কিছুই জানেন না। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে নির্বাচনের আগপর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের সাথে দফায় দফায় বৈঠক প্রসঙ্গে শফিকুর রহমানের দাবি, তাদের সাথে নির্বাচন নিয়ে আলাপ হয়েছিল শুধু, চুক্তির বিষয়ে তিনি জানতেন না।






