স্বপ্ন প্রতিদিন রিপোর্ট
অগ্রণী ব্যাংকের সৈয়দপুর শাখার সিনিয়র অফিসার আলিমুল আল রাজি তমালের বিরুদ্ধে প্রায় ৪৩ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রায় দুই বছর ধরে সহকর্মীদের আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে নিজের এবং কয়েকটি ভুয়া ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে তিনি এই অর্থ সরিয়ে নিয়েছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শুরু থেকে ২০২৫ সালের ৩০শে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ের মধ্যে এই অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি—প্রায় ১৫ কোটি টাকা—রংপুর বাস টার্মিনাল এলাকার ইসলামী ব্যাংকিং উইন্ডো শাখার একটি হিসাব থেকে সরানো হয়েছে।
এ জালিয়াতির ঘটনায় তমালকে সহযোগিতা করেছেন শাখার সাবেক ম্যানেজার আবদুল লতিফ—এমন তথ্যও প্রতিবেদনে রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, সহযোগিতার বিনিময়ে আবদুল লতিফ ৪৫ লাখ টাকা নিয়েছেন। তবে তিনি দাবি করেছেন, এটি ছিল তার প্রাপ্য টাকা এবং নিয়ম মেনেই লেনদেন করা হয়েছে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, তমালের এই অর্থ আত্মসাতে সহায়তা করে প্রায় ডজনখানেক ব্যাংক কর্মকর্তা লাভবান হয়েছেন। প্রতিবেদনে তাদের তথ্যও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
অভিযুক্ত আলিমুল আল রাজি তমাল
যেসব ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে টাকা সরানো হয়েছে, তার মধ্যে নিলুফার আক্তার ও রোদেলা আক্তারের নামে খোলা সুপার সেভিংস হিসাব উল্লেখযোগ্য। নিলুফার আক্তারের হিসাবে আরটিজিএসের মাধ্যমে ৭ কোটি ২৭ লাখ টাকা এবং রোদেলা আক্তারের হিসাবে ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা পাঠানো হয়।
তবে এসব হিসাবের সঙ্গে যুক্ত মোবাইল নম্বরগুলো বন্ধ পাওয়া গেছে। এমনকি যে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য দিয়ে হিসাবগুলো খোলা হয়েছে, তার সঙ্গে ব্যাংকের ওয়েবসাইটে থাকা তথ্যের কোনো মিল নেই। হিসাবগুলোর বিপরীতে ওয়েবসাইটে ছবি, স্বাক্ষর বা হিসাব খোলার আবেদনপত্রের কোনো কপিও পাওয়া যায়নি।
কেন হিসাব খোলার আবেদনপত্র, ছবি বা স্বাক্ষর নেই, কিংবা কেন ভুয়া নাম-ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে—এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো উত্তর দিতে পারেননি সৈয়দপুর শাখার বর্তমান ব্যবস্থাপক মশিউর রহমান।
তিনি বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র এক মাস হয়েছে, তাই বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত নন। তদন্ত শেষ হলে বিস্তারিত জানা যাবে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, তমাল নিজের সুপার সেভিংস হিসাবেও প্রায় ১০ কোটি টাকা স্থানান্তর করেছেন। তার বড় ছেলের নামে খোলা ‘তৌহিদ ডেইরি খামার’-এর চলতি হিসাবে প্রায় অর্ধ কোটি টাকা সরানো হয়। এছাড়া তমালের সহযোগী ব্যাংক কর্মকর্তা আবদুল লতিফের শ্যালক মেহেদী হাসানের প্রতিষ্ঠান ‘মননুজান ট্রেডার্স’-এর হিসাবে প্রায় ৪০ লাখ টাকা স্থানান্তর করা হয়েছে।
তবে মেহেদী হাসান বলেন, ভালো সম্পর্কের কারণে তিনি তমালকে একটি চেক দিয়েছিলেন। তমাল তার দুলাভাইয়ের সহকর্মী হওয়ায় সম্পর্কের খাতিরে চেক দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তিনি নিজে কোনো টাকা তোলেননি বলে দাবি করেন।
অন্যদিকে কোনো ভাউচার বা চেক-রশিদ ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে কোটি কোটি টাকার লেনদেন হলেও শাখাটির সাবেক ব্যবস্থাপক মো. মনিরুজ্জামান বিষয়টি ধরতে পারেননি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি দায় চাপান ব্যাংকের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের আইটি বিভাগের ওপর।
তার দাবি, অতিরিক্ত আরটিজিএস লেনদেন হলেও আইটি টিম তাকে এ বিষয়ে অবহিত বা সহায়তা করেনি।
ব্যাংকের শাখাগুলো তদারকি করে জোনাল অফিস ও জিএম অফিস। গত এক বছরে সৈয়দপুর শাখায় চারবার নিরীক্ষা হলেও কেন এত বড় জালিয়াতি ধরা পড়েনি—এ বিষয়ে অগ্রণী ব্যাংকের রংপুর জোনাল ম্যানেজার জহির রায়হান বলেন, জনবল সীমিত এবং আইটি-দক্ষ কর্মীর অভাব রয়েছে। তিন মাস পরপর স্যাম্পলিং পদ্ধতিতে পরিদর্শন করা হয়, তাই বিষয়টি ধরা পড়েনি।
রংপুর জোনের জেনারেল ম্যানেজার সুধীর রঞ্জন বিশ্বাস বলেন, শাখায় গিয়ে চেক-ভাউচার যাচাই করা জিএমের কাজ নয়; এটি শাখা ব্যবস্থাপক ও জোনাল অফিসের দায়িত্ব। তবে তিনি মনে করেন, এখানে আইটি বিভাগেরও কিছু দায় থাকতে পারে।
অগ্রণী ব্যাংকের রংপুর অঞ্চলের আইন উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান রিনো বলেন, এ ঘটনায় শাখা ব্যবস্থাপক, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং আইটি বিভাগের দায় রয়েছে; কেউ দায় এড়াতে পারবেন না। তবে আত্মসাৎ করা পুরো অর্থ উদ্ধার করা সম্ভব হবে কি না—সে বিষয়ে তিনি সংশয় প্রকাশ করেন।
অন্যদিকে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আনোয়ারুল ইসলাম আইটি টিমের দায় দেখছেন না।
তিনি জানান, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে।
প্রধান অভিযুক্ত আলিমুল আল রাজি তমালকে খুঁজতে রংপুর শহরের রহমতপুরের বর্তমান ঠিকানা এবং নীলফামারী সদরের কাঞ্চনপাড়া এলাকার স্থায়ী ঠিকানায় গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি।
পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন সহকর্মী ও স্বজন জানিয়েছেন, বাবা, স্ত্রী ও দুই ছেলেকে নিয়ে তিনি বর্তমানে দুবাইয়ে অবস্থান করছেন।
তমালের ছোট ভাই তুহিন সালেহীন বলেন, তার বড় ভাই রংপুরেই থাকেন। কিছুদিন আগে ব্যাংক থেকে কয়েকজন এসে তাকে খুঁজেছেন। এরপর থেকেই তার ফোন বন্ধ রয়েছে।
তমাল দুবাইয়ে গেছেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তুহিন বলেন, এ বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন। তবে আগে কয়েকবার পরিবারসহ তমাল দুবাই গিয়েছিলেন এবং সেখানে তার ব্যবসা রয়েছে—কাঁচা সবজি ও জনবল পাঠানোর কাজ করেন তিনি।
ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, গত ১৫ জানুয়ারি থেকে তমাল অফিসে অনুপস্থিত। এ ঘটনায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছে। বিষয়টি পুলিশ থেকে রংপুর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কার্যালয়কে জানানো হয়েছে।
পরে মামলা করার অনুমতি চেয়ে ঢাকায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে আবেদন করেছে রংপুর অফিস।







