চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের বর্তমান পর্ষদের পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হচ্ছে আজ ২২শে ফেব্রুয়ারি, রোববার। স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন অনুযায়ী, কোনো সিটি কর্পোরেশনের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার তারিখ থেকে পাঁচ বছর মেয়াদ গণনা করা হয়। সেই হিসেবে ২০২১ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারি প্রথম সভা হওয়ায় আজ চট্টগ্রাম সিটির বর্তমান পর্ষদের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। তবে মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পরও নিজের চেয়ার ছাড়তে নারাজ বিএনপির চট্টগ্রাম নগর কমিটির সাবেক আহ্বায়ক ডা. শাহাদাত হোসেন। এ নিয়ে নগরীর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে আইনি বিতর্ক। শাহাদাত বলছেন, স্থানীয় সরকার আইনের একটি ধারা তাকে বহাল থাকার সুযোগ দেয়। তবে আইনবিদেরা বলছেন, ১৫ বছর আগেই সংশোধিত আইনে সেই পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট রাজনৈতিক ক্ষমতার পট-পরিবর্তনের পর মেয়রের চেয়ারে বসে পড়েন বিএনপি নেতা ডা. শাহাদাত হোসেন। তারপর থেকেই তিনি চসিকে দায়িত্ব পালন করছেন। ডা. শাহাদাতের দাবি, স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন ২০০৯-এর ৬ নম্বর ধারা অনুযায়ী পরবর্তী নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত তিনি এই পদে বহাল থাকতে পারবেন। এই বিষয়ে তিনি ব্যক্তিগতভাবে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং মন্ত্রণালয়ের সচিবের সঙ্গে কথা বলেছেন বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন। শাহাদাতের ভাষ্য অনুযায়ী মন্ত্রী তাকে আশ্বস্ত করেছেন যে নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত তার ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার আইনের ৬ নম্বর ধারা বা ‘সেকশন সিক্স’ প্রযোজ্য হবে। যেহেতু তিনি একজন “নির্বাচিত মেয়র”, তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে সিটি কর্পোরেশনে প্রশাসক নিয়োগের কোনো আইনগত সুযোগ নেই এবং এই সংক্রান্ত একটি অফিসিয়াল অর্ডার শীঘ্রই জারি করা হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
১৫ বছর আগেই পরিবর্তন হয়েছে আইন
ডা. শাহাদাত যে আইনের দোহাই দিয়ে স্বপদে থেকে যেতে চাইছেন, সংশ্লিষ্টরা বলছেন সেই আইনের রক্ষাকবচটি অনেক আগেই বিলুপ্ত করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন ২০০৯-এর ৬ নম্বর ধারায় ২০১১ সালে সংশোধনী এনে বর্তমান মেয়রের স্বপদে থাকার সব পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
১৭ বছর আগে মূল আইনে একটি শর্ত ছিল যে সিটি কর্পোরেশনের মেয়াদ শেষ হওয়া সত্ত্বেও তা পুনর্গঠিত সিটি কর্পোরেশনের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত আগের পর্ষদ দায়িত্ব পালন করে যাবে। কিন্তু ২০১১ সালের ১লা ডিসেম্বর এক সরকারি গেজেটের মাধ্যমে এই শর্তটি পুরোপুরি বিলুপ্ত করা হয়। বর্তমানে ওই ধারায় শুধু একটি বাক্যই অবশিষ্ট আছে যেখানে বলা হয়েছে যে কর্পোরেশনের মেয়াদ হবে উহার প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হইবার তারিখ হইতে পাঁচ বৎসর।
আইনের পরিশিষ্ট অংশে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) (সংশোধন) আইন ২০১১-এর ৪ ধারাবলে আগের পর্ষদের দায়িত্ব পালনের সুযোগটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। ফলে শাহাদাত হোসেন যে আইনি ব্যাখ্যার ওপর দাঁড়িয়ে দায়িত্ব চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন, তা বর্তমানে অস্তিত্বহীন।
আইনবিদদের মতে ২০১১ সালের সেই গেজেট প্রকাশের পর থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ মেয়রের দায়িত্বে থাকার কোনো আইনগত সুযোগ আর অবশিষ্ট নেই। ১৫ বছর আগে করা এই সংশোধনীর কারণেই এখন মেয়াদ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মেয়রের ক্ষমতা বিলুপ্ত হওয়ার কথা।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ইতিহাসে এই আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে প্রশাসক নিয়োগের নজিরও রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহ আগে দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হলে নির্বাচন স্থগিত হয়ে যায়। সেই সংকটকালে তৎকালীন মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরপরই ২০২০ সালের ৪ঠা আগস্ট খোরশেদ আলম সুজনকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
মূলত স্থানীয় সরকার আইনের এই কড়াকড়ির কারণেই তখন বিদায়ী মেয়রকে আর দায়িত্বে রাখা সম্ভব হয়নি। বর্তমান পরিস্থিতিতেও আইনজ্ঞরা সেই একই প্রশাসনিক পদক্ষেপের পুনরাবৃত্তি দেখছেন।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্থানীয় সরকার আইন ২০০৯-এর ৬০ নম্বর ধারার ২৫.১ (১) উপধারা অনুযায়ী, যা ২০১১ সালে সংশোধিত হয়েছে, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে এখন প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া ছাড়া সরকারের সামনে অন্য কোনো বিকল্প খোলা নেই।
এই ধারায় বলা হয়েছে যে কোনো সিটি কর্পোরেশন মেয়াদোত্তীর্ণ হলে সরকার নতুন পর্ষদ গঠিত না হওয়া পর্যন্ত কার্যাবলী সম্পাদনের উদ্দেশ্যে একজন উপযুক্ত ব্যক্তি বা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত কর্মকর্তাকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ প্রদান করতে পারবে। ফলে ডা. শাহাদাত হোসেনের স্বপদে থাকার ব্যক্তিগত ইচ্ছা ও মন্ত্রীর মৌখিক আশ্বাসের চেয়ে এই আইনি ধারাটি এখন অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে সামনে এসেছে।
তিন সিটিতে নতুন ভোটের হাওয়া
মেয়াদ শেষ হওয়ার এই ডামাডোলের মধ্যেই চট্টগ্রামসহ ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে নির্বাচনের জোর প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে ইতিমধ্যেই নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) এই বিষয়ে চিঠি দিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
ইসির নির্বাচন পরিচালনা শাখার কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন, স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবের পাঠানো সেই চিঠি নিয়ে কমিশনে উপস্থাপনের প্রস্তুতি চলছে। চিঠিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২১ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হওয়ায় এর মেয়াদ শেষ হচ্ছে ২২শে ফেব্রুয়ারি। আইন অনুযায়ী মেয়াদের শেষ ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা থাকায় কমিশন এখন ভোটের তোড়জোড় শুরু করেছে।
যেভাবে মেয়র-এর পদে বসেছেন ডা. শাহাদাত
২০২৪ সালের ১লা অক্টোবর চট্টগ্রাম নগর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক ডা. শাহাদাত হোসেনকে ‘মেয়র’ ঘোষণা করে রায় দেন আদালত। এমন রায় নিয়ে তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি হয়। চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষ এর ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান।
২০২১ সালের ২৭শে জানুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বীর মুক্তিযোদ্ধা এম রেজাউল করিম চৌধুরী ৩ লাখ ৬৯ হাজার ২৪৮ ভোট পেয়ে মেয়র নির্বাচিত হন। সেখানে শাহাদাত পান মাত্র ৫২ হাজার ৪৮৯ ভোট।
ওই বছরের ২৪শে ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এনে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন শাহাদাত। ৩ বছর পর আদালত হঠাৎ সেই মামলার রায় ঘোষণা করেন। ৭ দিন পর ২০২৪ সালের ৮ই অক্টোবর নির্বাচন কমিশন বিএনপির হাইকমান্ডের মবের শিকার হয়ে শাহাদাতকে মেয়র ঘোষণার সংশোধিত প্রজ্ঞাপন জারি করে।
এরপর ওই বছরের ১৭ই অক্টোবর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় আগের একটি অপসারণ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনের ক্রমিক নম্বর ৩, অর্থাৎ চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র শব্দগুচ্ছ বিলুপ্ত করে সংশোধনী এনে ডা. শাহাদাত হোসেনের জন্য মেয়রের আসনটি নিশ্চিত করে।






