নিজস্ব প্রতিবেদক

ঢাকা, ১ জানুয়ারি ২০২৬: কর ফাঁকি রোধ এবং অবৈধ মোবাইল হ্যান্ডসেটের ব্যবহার বন্ধ করতে সরকারের উদ্যোগে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিফিকেশন রেজিস্টার (এনইআইআর) ব্যবস্থা আজ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়েছে। এর ফলে নতুন করে নেটওয়ার্কে যুক্ত হওয়া অবৈধ বা অনিবন্ধিত হ্যান্ডসেটগুলো শনাক্ত হয়ে একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি) জানিয়েছে, বর্তমানে ব্যবহৃত ফোনগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিবন্ধিত হবে এবং কোনো ব্যবহারকারীর ফোন এখনই বন্ধ হবে না।
এনইআইআর পদ্ধতি চালুর প্রতিবাদে এদিন বিকাল ৪টার পর রাজধানীর আগারগাঁও টেলিকম খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুর চালিয়েছেন মোবাইল ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীরা এনিআইআর স্থগিতদের দাবি করেছে।
পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার ইবনে মিজান বলছেন, “ওরা আকস্মিকভাবে হামলা চালিয়েছে, ইটপটকেল ছুঁড়ে মারছে। আমরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছি।”
বিটিআরসির একজন কর্মকর্তা বলেন, তারা আসরের নামাজ পড়ছিলেন, এ সময় বাইরে থেকে ইটপাটকেল মারা শব্দ পান। তিনি বলেন, বিকাল ৫টার দিকে সেখানে সেনাবাহিনীর একাধিক দল এসে পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।
এনইআইআর চালুর প্রতিবাদে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশের মোবাইল হ্যান্ডসেট ব্যবসায়ীরা তীব্র আন্দোলন করে আসছেন। ডিসেম্বর মাসে তারা বিটিআরসি কার্যালয়ের সামনে সড়ক অবরোধ, ঘেরাও, মানববন্ধন এবং দেশজুড়ে দোকান বন্ধের মতো কর্মসূচি পালন করেন। কারওয়ান বাজারে এক বিক্ষোভে টায়ারে আগুন ও যানবাহন ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে।
ব্যবসায়ীরা দাবি করেন, এনইআইআরের বর্তমান কাঠামো তাদের ব্যবসা ধ্বংস করবে এবং বাজারে সিন্ডিকেট সৃষ্টি করবে। যদিও সরকার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে একাধিকবৈঠক করে কিছু সুবিধা দিয়েছে, তবু আন্দোলন পুরোপুরি থামেনি।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এনইআইআরের মাধ্যমে অবৈধ পথে আসা ক্লোনড, পুরনো বা নিম্নমানের ফোনের ব্যবহার বন্ধ হবে। এতে রাষ্ট্রীয় রাজস্ব বাড়বে, চুরি হওয়া ফোন শনাক্ত করা সহজ হবে এবং ভোক্তারা নিরাপদ ডিভাইস পাবেন। প্রবাসীরা ব্যক্তিগত ফোনসহ দুটি নতুন হ্যান্ডসেট আনতে পারবেন এবং তিন মাসের মধ্যে নিবন্ধনের সুযোগ পাবেন।
এনইআইআরের কারণে মোবাইল হ্যান্ডসেট ব্যবসায়ীদের সম্ভাব্য সমস্যা ও তাদের অভিযোগসমূহ
মোবাইল বিজনেস কমিউনিটি বাংলাদেশ (এমবিসিবি) নেতাদের বক্তব্য এবং বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, এনইআইআর চালু হলে ব্যবসায়ীরা নিম্নলিখিত সমস্যার মুখোমুখি হতে পারেন:
স্টকের বিপুল ক্ষতি: বর্তমানে বাজারে প্রায় ৫০ লাখ অবৈধ বা ডিউটি ফাঁকি দেওয়া হ্যান্ডসেটের স্টক রয়েছে। এগুলো বিক্রি না হলে ব্যবসায়ীরা কোটি কোটি টাকার লোকসানে পড়বেন।
ব্যবসা সংকোচন ও চাকরি হ্রাস: দেশে প্রায় ২৫ হাজার মোবাইল ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং ২০ লাখের বেশি মানুষ এ খাতের সঙ্গে জড়িত। অবৈধ আমদানি বন্ধ হলে ছোট-মাঝারি ব্যবসায়ীরা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
দাম বৃদ্ধি: বৈধ আমদানিতে উচ্চ শুল্কের কারণে ফোনের দাম বেড়ে যাবে, যা বিক্রি কমিয়ে দেবে।
সিন্ডিকেট সৃষ্টি: বর্তমান নিয়মে কয়েকটি বড় কোম্পানির একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বাড়বে, ছোট ব্যবসায়ীরা আমদানি করতে পারবেন না।
নিবন্ধন প্রক্রিয়ার জটিলতা: ব্যবহৃত বা দ্বিতীয় হাতের ফোন নিবন্ধনে জটিলতা থাকায় বেচাকেনা কমে যাবে।
ব্যবসায়ীদের প্রধান অভিযোগসমূহ:
এনইআইআর সংস্কার না করে হঠাৎ চালু করা হয়েছে, যা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ধ্বংস করবে এবং শুধু বড় গোষ্ঠীকে লাভবান করবে।
আমদানিতে সিন্ডিকেট প্রথা বাতিল করে সবার জন্য উন্মুক্ত করার দাবি।
কমপক্ষে ৬ মাসের গ্রেস পিরিয়ড এবং স্টক ক্লিয়ার করার সুযোগ চান।
শুল্কহার আরও কমানো এবং ভেন্ডর তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া সহজ করার দাবি।
প্রকল্পটি সরকারি অর্থায়নে করা এবং পাইলট পর্যায়ে পরীক্ষা করার প্রস্তাব।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এনইআইআর দেশের টেলিকম খাতকে সুরক্ষিত ও সংগঠিত করবে। তবে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে বলে বিটিআরসি সূত্র থেকে জানা যায়।