স্বপ্ন প্রতিদিন ডেস্ক
কুমিল্লার লাকসামে ‘ইকরা মহিলা আবাসিক মাদ্রাসা’ এখন এক আতঙ্কের নাম। একের পর এক ছাত্রীর অস্বাভাবিক মৃত্যু এবং ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ এই প্রতিষ্ঠানটির দিকে আঙ্গুল তুলছে। সবশেষ সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী সামিয়া আক্তারের (১৩) মৃত্যু রহস্য নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। একদিকে ময়নাতদন্তের রিপোর্টে ধর্ষণের ভয়াবহ আলামত, অন্যদিকে ডিএনএ রিপোর্টে ‘নেতিবাচক’ ফলাফল সব মিলিয়ে এক গভীর ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত পাচ্ছেন নিহতের স্বজন ও স্থানীয়রা।
সামিয়া আক্তারের মৃত্যুর আগে দেওয়া জবানবন্দি এই মামলার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। স্বজনদের দাবি, মৃত্যুর ঠিক আগে নার্সের কাছে সামিয়া বলে গেছে, “হুজুর বোরকা পরে এসে রাতে রুম থেকে নিয়ে যেত, তারপর রাতভর চলত নির্যাতন।” ধর্ষণের ফলে সামিয়া মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়লে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ ঘটনাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে তাকে ছাদ থেকে ফেলে দেওয়ার নাটক সাজায় বলে অভিযোগ উঠেছে।
মামলার তদন্তে সবচেয়ে বড় জটিলতা তৈরি হয়েছে ফরেনসিক ও ডিএনএ রিপোর্টের বৈপরীত্য নিয়ে। চিকিৎসকের দেওয়া ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে সামিয়ার যৌনাঙ্গ ও পায়ুপথে ভয়াবহ যৌন নির্যাতনের আলামত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। আশ্চর্যজনকভাবে ডিএনএ পরীক্ষায় কোনো আলামত পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেছে পুলিশ। মাদ্রাসার ১২ জন শিক্ষক-কর্মচারীর ডিএনএ পরীক্ষা করা হলেও কারো সাথে মেলেনি।
এই বৈপরীত্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মামলার বাদী ও সামিয়ার মা শারমিন আক্তার। তার দাবি, প্রভাবশালীদের চাপে তদন্ত ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের দাবি, সামিয়া ৫ তলার জানালার ৬ ইঞ্চি ফাঁক দিয়ে পালাতে গিয়ে নিচে পড়ে মারা গেছে। কিন্তু সরেজমিনে দেখা গেছে, মাত্র ৬ ইঞ্চি গ্রিলের ফাঁক দিয়ে একজন কিশোরীর বের হওয়া অসম্ভব। এছাড়া মাদ্রাসাজুড়ে অসংখ্য সিসি ক্যামেরা থাকলেও রহস্যজনকভাবে ঘটনার সময়কার সব ক্যামেরা ‘বিকল’ ছিল বলে দাবি করেছেন মাদ্রাসার মুহতামিম মাওলানা জামাল উদ্দিন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই মাদ্রাসায় ছাত্রীদের শারীরিক ও যৌন নির্যাতন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। ২০২১ সালের ঘটনা নুসরাত (১০) নামের এক শিশু রান্না করা গরম ডালের পাতিলে পড়ে মারা গেছে বলে প্রচার করা হয়। অভিযোগ আছে, সে সময়ও বড় অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ঘটনাটি ধামাচাপা দিয়েছিল কর্তৃপক্ষ।
প্রথম তদন্তকারী কর্মকর্তা সামিয়ার শরীরে মারাত্মক আঘাত থাকলেও রিপোর্টে শুধু ‘হাতের ইনজুরি’ উল্লেখ করেছিলেন। যা নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।
বর্তমানে মামলাটির তদন্ত চলমান রয়েছে। সত্য উদঘাটনে সামিয়ার লাশ পুনরায় কবর থেকে তুলে ময়নাতদন্তের পরিকল্পনা করছে প্রশাসন।
সন্তানহারা মা শারমিন আক্তার বলেন, “আমার মেয়েটা মরার আগে সব বলে গেছে। ওরা ওকে ধর্ষণ করে ছাদ থেকে ফেলে মেরেছে। আমি টাকার বিনিময়ে আপোষ চাই না, আমি খুনিদের ফাঁসি চাই।”
লাকসামের এই ঘটনায় প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকা ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত না হলে ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আড়ালে এমন অপরাধ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন মানবাধিকার কর্মীরা।






