গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের বজড়া কঞ্চিবাড়ী গ্রামের আফরুজা বেগমকে গত ২২ এপ্রিল কুকুরে কামড়ায়। প্রথমে তাঁকে গাইবান্ধা সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে জলাতঙ্কের টিকা পাননি। এর পর তাঁকে নেওয়া হয় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানেও সরকারি টিকা মেলেনি। পরে চিকিৎসকের পরামর্শে বাইরের দোকান থেকে কিনে তাঁকে টিকা দেওয়া হয়। ১৮ দিন পর গত সোমবার রাতে তিনি মারা যান। আফরুজা বেগমের ছেলে মোনারুল ইসলাম জানান, টিকা দেওয়ার পরও তাঁর মায়ের মধ্যে জলাতঙ্ক রোগের প্রায় সব উপসর্গ ফুটে ওঠে। তিনি পানি দেখলেই ভয় পেতেন। পানি খেতে চাইতেন না। গোসল করতে চাইতেন না। খাবারও খেতে চাইতেন না। জ্বর, খিঁচুনি উঠত। মাঝেমধ্যে পরিবারের সদস্যদের ওপর আক্রমণ করে বসতেন। শুধু আফরুজা বেগম নন; গত আট দিনে জলাতঙ্কে আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে। তারাও একই দিন কুকুরের আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন। সবশেষ গতকাল বুধবার দুপুরে মারা যান ধুবনী বাজার এলাকার আবদুস সালামের স্ত্রী সুলতানা বেগম (৩৯)।
গত ২২ এপ্রিল মোট ১৬ জন কুকুরের আক্রমণের শিকার হন। সময়মতো টিকা নিলে জলাতঙ্ক রোগ প্রায় শতভাগ প্রতিরোধযোগ্য। স্থানীয়রা জানান, একাধিক সরকারি হাসপাতালে গিয়ে তারা কেউই জলাতঙ্কের টিকা পাননি। পরে বাইরে থেকে কিনে টিকা দেন। কিন্তু তার পরেও একের পর এক মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে।
জলাতঙ্কে মারা যাওয়া অন্য তিনজন হলেন বজড়া কঞ্চিবাড়ী গ্রামের নন্দরানী, ফুল মিয়া ও রত্নেশ্বর। এর মধ্যে নন্দরানী ও ফুল মিয়া মারা যান গত ৬ মে আর রত্নেশ্বর মারা যান ৮ মে। আক্রান্তদের মধ্যে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ইউনিয়নের বজড়া কঞ্চিবাড়ী গ্রামের লুৎফর রহমানের স্ত্রী ফজিতন নেছা, আশরাফুল আনন্দের স্ত্রী রুমিনা বেগম, লাল মিয়ার ছেলে নজরুল ইসলাম, মৃত উমিতুল্লাহ বেপারীর ছেলে হামিদুল ইসলাম, জয়নাল আবেদিনের স্ত্রী গোলেনুর বেগম, মনসুর আলীর মেয়ে মিতু আক্তার, শহিদুল ইসলামের ছেলে আতিকুর মিয়া, খাইরুল ইসলামের মেয়ে লাবণ্য আক্তার এবং আনিছুর রহমানের ছেলে বিজয় হোসেন। উপজেলা প্রশাসন ও ইউনিয়ন পরিষদ আহত ও নিহতের তালিকা নিশ্চিত করেছে। আক্রান্তরা কেউ হাসপাতালে থেকে এবং কেউ কেউ বাড়িতে থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গত ২২ এপ্রিল সকালে ধর্মপুর এলাকা থেকে আসা একটি কুকুর প্রথমে বিষ্ণুময়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে নন্দরানীকে কামড়ায়। পরে একই গ্রামের আরও ১৫ জনকে আক্রমণ করে। শেষ পর্যন্ত এক ব্যক্তি কুকুরটিকে পিটিয়ে হত্যা করেন।
আফরুজা বেগমের ছেলে মোনারুল ইসলাম বলেন, ‘হাসপাতালে টিকা থাকলে হয়তো মাকে বাঁচানো যেত। টিকা না থাকা আর অবহেলার কারণেই আমরা তাঁকে হারিয়েছি।’ একই অভিযোগ করেন সুলতানা বেগমের স্বামী সালাম মিয়া। তিনি বলেন, সরকারি হাসপাতালে টিকা না পেয়ে বাইরে থেকে কিনে তাঁর স্ত্রীকে দেওয়া হয়। তবে সেই টিকার কার্যকারিতা নিয়ে তাদের মধ্যে শঙ্কা ছিল। স্থানীয় ইউপি সদস্য তাজরুল ইসলাম বলেন, কুকুরটি অনেকের নাক-মুখ ও চোখে কামড় দিয়েছে। এতে আক্রান্তদের অবস্থা বেশি জটিল হয়েছে।
জানতে চাইলে ঢাকার জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউটের মেডিকেল অফিসার এনামুল হক বলেন, জলাতঙ্কে আক্রান্ত মানুষের শরীরে বেশ কিছু লক্ষণ দেখা দিতে পারে। তার মধ্যে আছে আক্রান্ত স্থানে ব্যথা, জ্বর, খিঁচুনি, পানি ও বাতাসের প্রতি অনীহা, আচার-আচরণের পরিবর্তন ইত্যাদি। তবে টিকা নেওয়ার পর সাধারণত জলাতঙ্কে আক্রান্ত মানুষ মারা যায় না। যদি মারা যায়, সে ক্ষেত্রে টিকার কার্যকারিতার মান যাচাই এবং নিয়মানুযায়ী ডোজ সম্পন্ন করেছে কিনা, সেটি যাচাই করতে হবে।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. দিবাকর বসাক বলেন, জলাতঙ্কে আক্রান্ত কুকুর মানুষকে কামড় দিলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে টিকা নিতে হবে। সেই সঙ্গে আক্রান্ত স্থান ড্রেসিং করে নিতে হবে। কুকুর মানুষের শরীরের যত ওপরের অংশে কামড় দেবে, তত তাড়াতাড়ি আক্রান্ত ব্যক্তি অসুস্থ হয়ে পড়বে। সেই সঙ্গে জলাতঙ্ক জীবাণু মানুষের স্নায়ুতন্ত্রে পৌঁছে গেলে তার বাঁচার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ হয়ে পড়ে। ডা. দিবাকর বসাক জানান, দেড় বছর ধরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জলাতঙ্কের টিকা সরবরাহ নেই। আক্রান্ত রোগীদের বাইরে থেকে টিকা কিনে আনার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বহুবার চাহিদাপত্র পাঠানো হলেও সরবরাহ পাওয়া যায়নি।
গাইবান্ধার সিভিল সার্জন ডা. রফিকুজ্জামান বলেন, জলাতঙ্কের টিকা দীর্ঘদিন সরবরাহ না থাকায় সরকারি হাসপাতালে রোগীদের দেওয়া সম্ভব হয়নি। সময়মতো টিকা দেওয়া গেলে রোগীকে বাঁচানো সম্ভব।
অন্যান্য জেলায়ও টিকার সংকট
দেশের অন্যান্য জেলায়ও জলাতঙ্কের টিকার সংকটের খবর পাওয়া গেছে। খুলনা জেনারেল হাসপাতালে পোষা বিড়ালের আঁচড়ে আহত ছয় বছরের শিশু আশা মণিকে বাইরে থেকে ৮০০ টাকা দিয়ে টিকা কিনতে হয়েছে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, নওগাঁ, বরিশাল, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বিভিন্ন জেলায় সরকারি টিকার সরবরাহ অপ্রতুল বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে জুন পরিকল্পনা ছাড়াই পাঁচ বছর মেয়াদি স্বাস্থ্য খাত কর্মসূচি স্থগিত করা হয়। এরপর অর্থের সংকট দেখা দেয়। এর প্রভাব পড়ে স্বাস্থ্য খাতের রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিতে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর টাকার ব্যবস্থা না করে হাসপাতালের অন্য ফান্ড থেকে টিকা কেনার জন্য নির্দেশনা দেয়। এ ছাড়া নতুন করে টিকা কেনার দরপত্রেও জটিলতা দেখা দেয়। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় টিকা সংগ্রহ ব্যাহত হয়। এর প্রভাব পড়ে হাম, জলাতঙ্কসহ বেশ কিছু টিকায়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ বলেন, জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছিল। কুকুর ও মানুষের টিকাদানে বড় বিনিয়োগ করা হয়েছিল। কিন্তু কার্যক্রম থেমে যাওয়ায় সেই অর্জন এখন ঝুঁকির মুখে। তিনি বলেন, দেশে প্রতিবছর পাঁচ-ছয় লাখ মানুষ কুকুর-বিড়ালসহ বিভিন্ন প্রাণীর কামড়ের শিকার হন। আগে কেন্দ্রীয়ভাবে টিকা সংগ্রহ করা হলেও এখন বার্ষিক ক্রয় প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা সময়সাপেক্ষ। এতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অবহেলা উঠে এসেছে।
জানতে চাইলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সরকার ইউনিসেফের মাধ্যমে নতুন করে টিকা সংগ্রহের ব্যবস্থা করেছে। ইতোমধ্যে ৯ লাখ ডোজ জলাতঙ্কের টিকা কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে সংকট অনেকটা কমে আসবে।