গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়েছে। দেশের বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ঘুরে দেখা যায় প্রায় একই চিত্র। স্বাস্থ্য জনসংখ্যা পুষ্টি সেক্টর প্রোগ্রাম বাতিলের পর একের পর এক সংকট ও অব্যবস্থাপনা সামনে আসছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা প্রাপ্তিতে।
মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে, টিকা সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। টিকা পরিবহনের জন্য নিয়োজিত পোর্টারদের ভাতা বন্ধ থাকায় অনেক এলাকায় নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। নতুন নিয়োগ পাওয়া স্বাস্থ্য সহকারীরাও যথাযথ প্রশিক্ষণ ছাড়াই টিকা প্রয়োগ করছেন, যা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর আইএমসিআই (IMCI) কর্নারে কর্মরত ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শিশুদের চিকিৎসাসেবা দুর্বল হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে কম ওজন নিয়ে জন্ম নেওয়া নবজাতক এবং মারাত্মক অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য (F-100 ও F-70) সরবরাহও বন্ধ রয়েছে।
রংপুরের হারাগাছের এক মা তাছলিমা বেগম বলেন, “আমার বাচ্চাটা জন্মের পর থেকেই দুর্বল। হাসপাতালে নিয়ে গেলে বলে ওষুধ নাই। আমরা কোথায় যাবো?” এদিকে ভিটামিন-এ প্লাস ক্যাম্পেইন অনিয়মিত হয়ে পড়েছে, বন্ধ রয়েছে স্কুল ও মাদ্রাসায় কৃমিনাশক কর্মসূচিও। ফলে শিশুদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। অসংক্রামক রোগের চিকিৎসাতেও দেখা দিয়েছে স্থবিরতা। উপজেলা পর্যায়ে চালু থাকা ‘এনসিডি কর্নার’গুলো প্রয়োজনীয় ওষুধের অভাবে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের রোগীরা নিয়মিত চিকিৎসা পাচ্ছেন না।
ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ের বাসিন্দা সুমন হাওলাদার বলেন, “ডায়াবেটিসের ওষুধ নিতে হাসপাতালে যাই, কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই বলে ওষুধ নেই। বাইরে কিনতে গেলে খরচ অনেক।” জরুরি প্রসূতিসেবা প্রদানের জন্য চিকিৎসক ও নার্সদের বিশেষ প্রশিক্ষণও বন্ধ রয়েছে, যা মাতৃস্বাস্থ্যের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। একই সঙ্গে হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ কমে গেছে এবং বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রপাতির ঘাটতি দেখা দিয়েছে। পরিবহন ব্যবস্থাও ভেঙে পড়ার পথে। নতুন অ্যাম্বুলেন্স বরাদ্দ নেই, পুরোনোগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ বাজেট না থাকায় অনেকই অচল হয়ে পড়ছে। জরুরি রোগী পরিবহনে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। ঈদের পরদিন সড়ক দুর্ঘটনায় আহত কুমিল্লার দেবীদ্বারের এক রোগীর স্বজন জানান, “অ্যাম্বুলেন্স পাইনি, ভ্যানে করে রোগী নিয়ে যেতে হয়েছে। সময়মতো চিকিৎসা পেলে হয়তো অবস্থা এত খারাপ হতো না। আরেকটু দেরি হলে রোগীকে বাঁচানো যেত না।” অন্যদিকে হাসপাতালের মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনায়ও স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। বর্জ্য নিষ্পত্তির জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সরবরাহ বন্ধ থাকায় স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে।
মাঠপর্যায়ের তদারকিতেও সংকট তৈরি হয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের জন্য বরাদ্দকৃত জিপ গাড়ির তেল ও চালকের বেতন বন্ধ থাকায় অনেক গাড়িই অচল হয়ে পড়ছে, ফলে কমিউনিটি ক্লিনিক পরিদর্শন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। সার্বিক পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা পুরোপুরি ভেঙে পড়তে পারে, যার ভয়াবহ প্রভাব পড়বে দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর ওপর। এসব বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে সচিব পদমর্যাদার একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা অব্যবস্থাপনার দায় অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর চাপিয়ে স্বীকার করলেন, স্বাস্থ্যখাত পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের চেষ্টা করছে ক্ষমতাসীন সরকার।






